ভাবুন তো, আরবের তপ্ত মরুভূমির চেনা উট ঘুরে বেড়াচ্ছে হাজার হাজার কিলোমিটার দূরের অস্ট্রেলিয়ার বিশাল ও দুর্গম ‘আউটব্যাক’-এ। একসময় যা ছিল দূর-দূরান্তে পণ্য পরিবহনের একমাত্র ভরসা, আজ তা অস্ট্রেলিয়ার পরিবেশের জন্য যেমন চ্যালেঞ্জ, তেমনই জন্ম দিচ্ছে নতুন এক অর্থকরী সম্ভাবনার।
যেভাবে অস্ট্রেলিয়ায় পৌঁছাল উট
গল্পের শুরুটা প্রায় ২০০ বছর আগে, ঊনবিংশ শতাব্দীতে। তৎকালীন অস্ট্রেলিয়ার দুর্গম মরুভূমি ও অভ্যন্তরীণ অঞ্চলে পথচলা ও পণ্য পরিবহনের জন্য ভারতসহ বিভিন্ন অঞ্চল থেকে উট নিয়ে আসা হয়। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রেললাইন বসে, মোটরযানের জনপ্রিয়তা বাড়ে এবং উটের প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়ে যায়। ফলে অনেক উটকে ছেড়ে দেওয়া হয় খোলা প্রকৃতিতে।
বুনো পরিবেশে মানিয়ে নিয়ে উটের বংশবৃদ্ধি হতে থাকে দ্রুত গতিতে। তৈরি হয় বিশাল ‘ফেরাল’ বা বুনো উটের পাল।
পরিবেশের সংকট নাকি ব্যবসার সুযোগ?
বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ার মধ্যাঞ্চলে বিপুল সংখ্যক বুনো উট মুক্তভাবে ঘুরে বেড়ায়। খাদ্য ও পানির খোঁজে এগুলো প্রায়ই লোকালয়ে ঢুকে পড়ে। এতে ধ্বংস হচ্ছে বনাঞ্চল, নষ্ট হচ্ছে পানির উৎস ও খামারের সীমানা প্রাচীর। এক সময়ের পরিবহন সমাধান উট এখন অস্ট্রেলিয়া সরকারের জন্য বড় ব্যবস্থাপনা সমস্যা।
তবে এই সংকটকেই নতুন ব্যবসায়িক সম্ভাবনায় রূপ দিচ্ছেন স্থানীয় উদ্যোক্তারা।
বর্তমানে বুনো উট ধরে বাণিজ্যিকভাবে কাজে লাগানো হচ্ছে। গড়ে উঠেছে উটের মাংস, দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্য এবং পর্যটনভিত্তিক নতুন এক অর্থনৈতিক খাত।
আন্তর্জাতিক বাজারে অস্ট্রেলীয় উটের দুধ
বিশেষ করে উটের দুধ ঘিরে তৈরি হয়েছে বিশ্বব্যাপী নতুন এক বাজার। অস্ট্রেলিয়ার বেশ কয়েকটি আধুনিক উটের খামার থেকে তৈরি দুগ্ধজাত পণ্য আন্তর্জাতিক বাজারে পাঠানো হচ্ছে। এর মধ্যে উটের দুধ রপ্তানির বিশ্ববাজার দখলের প্রক্রিয়াও ত্বরান্বিত হচ্ছে। ফলে উট এখন আর কেবল মরুভূমির প্রাণী নয়, বরং কৃষি ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পের এক নতুন পণ্যে পরিণত হয়েছে।
তবে সুবিধার পাশাপাশি বিতর্কও কম নয়। বুনো উট পরিবেশের যে ক্ষতি করছে, তা কেবল ব্যবসায়িক খামার দিয়ে কতটা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব তা নিয়ে পরিবেশবিদদের মধ্যে আলোচনা চলছে।
এক সময়ের আরব ও ভারতীয় অঞ্চলের সেই উট আজ ক্যাঙ্গারুর দেশে একদিকে যেমন তৈরি করছে পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ, তেমনই অন্যদিকে খুলে দিচ্ছে নতুন বাণিজ্যের দুয়ার।

