অস্ট্রেলিয়ায় আসার পর আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের অনেকের জীবনেই একটি প্রশ্ন খুব দ্রুত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে—পড়াশোনা শেষে কী হবে? কোন বিষয়ে পড়লে চাকরির সুযোগ ভালো, কোন কোর্স ভবিষ্যতে স্থায়ী বসবাস বা পিআর (পার্মানেন্ট রেসিডেন্টস) এর পথে সহায়ক হতে পারে, কিংবা বর্তমান ভিসার পর পরবর্তী পদক্ষেপ কী হওয়া উচিত?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে এখন আর সবাই পেশাদার পরামর্শকের অফিসে যান না। কারণ সোশ্যাল মিডিয়ায় চোখ বুলালেই মেলে এমন হাজারও পরামর্শ। ফেসবুক গ্রুপ, ইউটিউব, টিকটক কিংবা বিভিন্ন কমিউনিটি পেজ খুললেই দেখা যায়—কেউ বলছেন কোন কোর্সে পিআর সহজ, কেউ কলেজ পরিবর্তনের পরামর্শ দিচ্ছেন, কেউ কোর্স পরিবর্তনের কথা বলছেন, কেউ আবার নিজের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে কোন ভিসা থেকে কোন ভিসায় যাওয়া উচিত সেটিও বুঝিয়ে দিচ্ছেন।
সাম্প্রতিক সময়ে বিশেষ করে অস্ট্রেলিয়ায় আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের মধ্যে এর প্রভাব প্রবলভাবে পড়ছে। অনেকেই সোশ্যাল মিডিয়ার ফাঁদে পা দিচ্ছেন, সঠিক যাছাই-বাছাই ছাড়া হাঁটছেন সোশ্যাল মিডিয়ার দেখানো পথে!
অভিজ্ঞতা ভাগাভাগি করা বা সরকারি তথ্য মানুষের কাছে সহজ ভাষায় পৌঁছে দেওয়ার মধ্যে সমস্যা নেই। কিন্তু সমস্যাটা শুরু হয় তখনই, যখন সাধারণ তথ্য দেওয়ার সীমা পেরিয়ে কারও ব্যক্তিগত পরিস্থিতি বিবেচনা করে তাকে নির্দিষ্ট ভিসা, পিআর পাথওয়ে কিংবা মাইগ্রেশন স্ট্রেটেজি নিয়ে পরামর্শ দেওয়া হয়। অস্ট্রেলিয়ায় অন্তত এটি ছড়িয়ে পড়েছে বিস্তত আকারে। অথচ দেশটির আইনে এই দুইয়ের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে।
অস্ট্রেলিয়ার মাইগ্রেশন আইন কী বলছে?
অস্ট্রেলিয়ান সরকারের ফেডারেল রেজিস্টার অব লেজিসলেশন-এ প্রকাশিত মাইগ্রেশন অ্যাক্ট ১৯৫৮-এর সেকশন ২৭৬ অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি যদি মাইগ্রেশন প্রক্রিয়া সম্পর্কে নিজের জ্ঞান বা অভিজ্ঞতা ব্যবহার করে অন্য কাউকে তার ভিসা অ্যাপ্লিকেশন, স্পনসরশিপ, নমিনেশন কিংবা সংশ্লিষ্ট মাইগ্রেশন বিষয়ে পরামর্শ দেন বা আবেদন প্রস্তুত করতে সহায়তা করেন, তাহলে সেটি ‘ইমিগ্রেশন অ্যাসিস্ট্যান্স’ বা অভিবাসন-সংক্রান্ত সহায়তার আওতায় পড়তে পারে।
তবে একই আইনে কিছু সাধারণ কাজকে ইমিগ্রেশন অ্যাসিস্ট্যান্সের বাইরে রাখা হয়েছে। যেমন—শুধু প্রশাসনিক কাজ, অনুবাদ ইত্যাদি। অর্থাৎ, কোনো ব্যক্তি যদি অস্ট্রেলিয়ার ডিপার্টমেন্ট অব হোম অ্যাফেয়ার্সের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত নতুন কোনো ভিসা নিয়ম সাধারণভাবে তুলে ধরেন কিংবা নিজের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা শেয়ার করেন, সেটি এক বিষয়। কিন্তু কোনো ব্যক্তির বয়স, পেশা, শিক্ষাগত যোগ্যতা, ইংরেজি স্কোর বা বর্তমান ভিসা স্ট্যাটাস বিবেচনা করে যদি তার ভিসা বা মাইগ্রেশন পরিস্থিতির সঙ্গে যুক্ত করে বলা হয়—“আপনার জন্য এই পথটি ভালো”, “এই ভিসায় আবেদন করুন” কিংবা “এভাবে পিআর-এর পথে এগোন”—তাহলে সেই পরামর্শ ইমিগ্রেশন অ্যাসিস্ট্যান্সের আওতায় পড়তে পারে।
এ বিষয়ে অস্ট্রেলিয়ার অফিস অব দ্য মাইগ্রেশন এজেন্টস রেজিস্ট্রেশন অথরিটি—ওমারা (OMARA) বলছে, অস্ট্রেলিয়ায় আইনগতভাবে ইমিগ্রেশন অ্যাসিস্ট্যান্স দিতে পারেন মূলত রেজিস্টার্ড মাইগ্রেশন এজেন্ট, লিগ্যাল প্র্যাকটিশনার অথবা আইনে নির্ধারিত কিছু ছাড়প্রাপ্ত ব্যক্তি। এমনকি একজন এডুকেশন এজেন্টও যদি রেজিস্টার্ড মাইগ্রেশন এজেন্ট বা লিগ্যাল প্র্যাকটিশনার না হন, তাহলে তিনি ইমিগ্রেশন অ্যাসিস্ট্যান্স দিতে পারবেন না।
তাহলে কারা দিতে পারেন মাইগ্রেশন পরামর্শ?
অস্ট্রেলিয়ার বর্তমান মাইগ্রেশন অ্যাক্ট অনুযায়ী, রেজিস্টার্ড মাইগ্রেশন এজেন্ট নন—এমন ব্যক্তি ইমিগ্রেশন অ্যাসিস্ট্যান্স দিতে পারেন না। তবে অস্ট্রেলিয়ান লিগ্যাল প্র্যাকটিশনার এবং আইনে নির্ধারিত ব্যক্তি নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে এ ধরনের সহায়তা দিতে পারেন।
ওমারা আরও জানিয়েছে, রেজিস্টার্ড মাইগ্রেশন এজেন্ট, লিগ্যাল প্র্যাকটিশনার অথবা অনুমোদিত ব্যক্তিই আইনগতভাবে ইমিগ্রেশন অ্যাসিস্ট্যান্স দিতে পারেন। সেটাও বিনা অর্থে।
অর্থের বিনিময়ে অননুমোদিত মাইগ্রেশন সহায়তা দেওয়া আরও গুরুতর বিষয়। অননুমোদিতভাবে এ ধরনের সহায়তার জন্য ফি বা অন্য কোনো পুরস্কার চাওয়া বা গ্রহণের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে।
এডুকেশন এজেন্ট হলেই কি তাহলে ভিসা পরামর্শ দেওয়া যায়?
একজন এডুকেশন এজেন্ট শিক্ষার্থীদের কোর্স, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা ভর্তি নিয়ে সহায়তা করতে পারেন। কিন্তু তিনি যদি একই সঙ্গে রেজিস্টার্ড মাইগ্রেশন এজেন্ট বা অস্ট্রেলিয়ান লিগ্যাল প্র্যাকটিশনার না হন, তাহলে ব্যক্তিগত পরিস্থিতি বিবেচনা করে মাইগ্রেশন পরামর্শ দেওয়ার অনুমতি স্বয়ংক্রিয়ভাবে পান না।
সমস্যা হচ্ছে, এই পার্থক্যটি অনেক সাধারণ শিক্ষার্থীর কাছেই পরিষ্কার নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কেউ নিজেকে বিশেষজ্ঞ হিসেবে উপস্থাপন করলে বা কোনো ভিডিওতে “এই কোর্স করলে পিআর সহজ”, “এই কলেজে গেলে ভবিষ্যৎ ভালো” কিংবা “এই ভিসা থেকে ওই ভিসায় চলে যান”—এমন বক্তব্য দিলে অনেক শিক্ষার্থী সেটিকেই নির্ভরযোগ্য পরামর্শ ধরে নেন।
ভুল পরামর্শ ও শিক্ষার্থীদের স্বপ্নভঙ্গ
নতুন আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীরা অস্ট্রেলিয়ার জটিল মাইগ্রেশন ব্যবস্থা সম্পর্কে পুরোপুরি অবগত না থাকায় সহজেই এমন প্রচারণায় প্রভাবিত হতে পারেন। কেউ কেউ হাজার হাজার ডলার খরচ করে কোর্স পরিবর্তন করেন, পছন্দের বিষয় ছেড়ে তথাকথিত ‘পিআর কোর্সে’ ভর্তি হন কিংবা এমন একটি পথ অনুসরণ করেন, যা কয়েক বছর পর তাদের পরিস্থিতির সঙ্গে আর মিলেই না।
এর ফলে শুধু টিউশন ফি বা সময়ের ক্ষতি নয়; ভুল তথ্যের ভিত্তিতে নেওয়া সিদ্ধান্ত ভিসা প্রত্যাখ্যান, ভিসা বাতিল, ভবিষ্যৎ আবেদন জটিল হওয়া কিংবা ভুয়া নথি ও ভুল তথ্য ব্যবহারের মতো আরও বড় সমস্যাও তৈরি করতে পারে।
অস্ট্রেলিয়া সরকারের স্টাডি অস্ট্রেলিয়া স্পষ্ট করেছে, কোনো এডুকেশন এজেন্ট বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পারমানেন্ট রেসিডেন্সি কিংবা ভবিষ্যতের মাইগ্রেশন ফলাফল নিশ্চিত করতে পারে না।
শিক্ষার্থীদের কী করণীয়?
এসব ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের জনপ্রিয় ভিডিও বা ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাকে চূড়ান্ত পরামর্শ হিসেবে না নিয়ে, মাইগ্রেশন বিষয়ে সিদ্ধান্তের আগে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির মাইগ্রেশন এজেন্ট রেজিস্ট্রেশন নম্বর—মার্ন ওমারার সরকারি রেজিস্টারে যাচাই করা এবং প্রয়োজন হলে অনুমোদিত পেশাজীবীর পরামর্শ নেওয়াই শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ পথ। তাতে স্বপ্নও ভঙ্গ হবে না, সেই সঙ্গে শিক্ষার্থীরা বেছে নিতে পারবেন নিরাপদ সমাধান।

