‘যখন পড়বে না মোর পায়ের চিহ্ন এই বাটে,
আমি বাইব না মোর খেয়াতরী এই ঘাটে…’
একদিন এই মুহূর্ত আসবে, জানা ছিল। তবু কিছু বিদায়ের জন্য বোধহয় কখনোই প্রস্তুত হওয়া যায় না। যে পায়ের ছন্দে দুই দশকের বেশি সময় ধরে স্বপ্ন দেখেছে একটি দেশ, যে বাঁ পায়ের জাদুতে আনন্দে-কান্নায় একাকার হয়েছে কোটি মানুষ—আকাশি-নীল-সাদা জার্সিতে সেই পায়ের চিহ্ন আর পড়বে না ফুটবলের সবুজ গালিচায়।
কিছু বিদায় বোধহয় এমনই। আসবে জেনেও মন চায় সময়টা আরেকটু থমকে থাকুক। শেষ বাঁশিটা আরেকটু দেরিতে বাজুক, চিরচেনা ১০ নম্বর মানুষটি আরেকটু ছুটে বেড়াক মাঠজুড়ে।
বুয়েন্স আইরেসের এস্তাদিও মনুমেন্তালে তাই রাতটা কেবল একটি ফুটবল ম্যাচের ছিল না। ৮৫ হাজারের বেশি মা নুষের সামনে সেটি ছিল ভালোবাসার মানুষটিকে শেষবার আকাশি-নীল-সাদা জার্সিতে চোখ ভরে দেখে নেওয়ার রাত। শেষবার তার পায়ে বল দেখার, শেষবার ‘মেসি, মেসি’ ধ্বনিতে গ্যালারি কাঁপানোর রাত।
আর বিদায়ের রাতেও গল্পের নায়ক বদলালেন না। গোল করলেন, করালেনও। বেনিনকে ৩-০ গোলে হারিয়ে আরও একবার বিজয়ীর বেশেই মাঠ ছাড়লেন ফুটবলের মহাতারকা—আর্জেন্টিনার জার্সিতে শেষবার।
মনুমেন্তালে নিজের ভক্তদের সামনে ১০ নম্বর জার্সিতে শেষবারের মতো এলেন লিওনেল মেসি। শেষবারের মতো আর্জেন্টিনার হয়ে ওয়ার্মআপ করলেন, জাতীয় সংগীতে দাঁড়ালেন, বল পায়ে ছুটলেন। গ্যালারিতে তখন মেসির ছবি, ১০ নম্বর জার্সি আর অসংখ্য প্ল্যাকার্ড। মাঠে মেলে ধরা হলো বিশাল জার্সি, আতশবাজিতে আলোকিত হলো মনুমেন্তাল। জাতীয় সংগীতের সময় চোখের জল ধরে রাখতে পারলেন না কোচ লিওনেল স্কালোনি। আবেগে ভেসেছেন সতীর্থ-ভক্তরা। একসময় অশ্রুসিক্ত হলো মেসির চোখও।
এর মাঝে ঘড়ির কাঁটা ১০ মিনিট ছুঁতেই থেমে গেল খেলা। মেসির ১০ নম্বরকে সম্মান জানাতে উঠে দাঁড়াল পুরো মনুমেন্তাল। সতীর্থ-প্রতিপক্ষ সবাই হাততালি দিলেন, গ্যালারি থেকে একসঙ্গে ধ্বনিত হলো প্রিয় অধিনায়কের নাম—‘মেসি, মেসি।’
তারপরও বিদায়ের আবেগকে মাঠের খেলায় প্রভাব ফেলতে দেননি মেসি। প্রথমার্ধে দূরপাল্লার শট ও ফ্রি-কিকে গোলের চেষ্টা করলেও বেনিনের রক্ষণ ভাঙতে পারেনি আর্জেন্টিনা। বিরতিতে ম্যাচ ছিল গোলশূন্য।
দ্বিতীয়ার্ধেই বদলে যায় দৃশ্যপট। ৪৮ মিনিটে মেসির কর্নার থেকে দুর্দান্ত ভলিতে গোল করেন নিকোলাস ওতামেন্দি। মেসির মতো এটিও ছিল আর্জেন্টিনার জার্সিতে ওতামেন্দির বিদায়ী ম্যাচ। ৬১ মিনিটে মেসির পাস থেকে চমৎকার ফিনিশিংয়ে ব্যবধান দ্বিগুণ করেন নিকো পাজ।
তবু রাতটির পূর্ণতার জন্য যেন আরেকটি দৃশ্য বাকি ছিল।
৭১ মিনিটে পেনাল্টি পায় আর্জেন্টিনা। বল হাতে এগিয়ে এলেন সেই পরিচিত ১০ নম্বর। জোরাল শটে বল জালে পাঠালেন মেসি। শেষ ম্যাচ। শেষ গোল। মনুমেন্তাল তখন আর স্টেডিয়াম নয়—আবেগের এক সমুদ্র। উল্লাসে তাকে ঘিরে ধরলেন সতীর্থরা।
শেষ পর্যন্ত বেনিনকে ৩-০ গোলে হারায় আর্জেন্টিনা। আর শেষ বাঁশির সঙ্গে শেষ হয় আন্তর্জাতিক ফুটবলের এক অনন্য অধ্যায়।
দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে যে জার্সিটিকে নিজের স্বপ্ন, গর্ব আর জীবনের অংশ বানিয়েছিলেন, সেই আর্জেন্টিনাকে মেসি দিয়ে গেলেন বিশ্বকাপ, দুটি কোপা আমেরিকা ও ফিনালিসিমার গৌরব। ছয়টি বিশ্বকাপ খেলে ২০২২ সালে ছুঁয়েছেন সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত সোনালি ট্রফি।
লম্বা ক্যারিয়ারে আকাশী-নীল জার্সিতে ২০৮ ম্যাচ। ১২৬ গোল। ৭০ অ্যাসিস্ট। সংখ্যাগুলো থেকে যাবে রেকর্ডের পাতায়। ট্রফিগুলো থাকবে ইতিহাসে। কিন্তু মনুমেন্তালের সেই শেষ রাত মনে করিয়ে দেবে অন্য কিছু—এক জীবনে একজন ফুটবলার কতটা ভালোবাসা পেলে, তার বিদায়ে গোটা একটি স্টেডিয়াম কাঁদে!
মেসি মাঠ ছেড়েছেন।
কিন্তু আর্জেন্টিনার আকাশী-নীল-সাদা জার্সিতে লেখা তার গল্পের আসলে কোনো শেষ বাঁশি নেই।


