বাংলাদেশে আইন পেশায় প্রবেশের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ বয়সসীমা ৩৫ বছর নির্ধারণের সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নপ্রবাসী ব্যারিস্টার ও সলিসিটর নুরুল খান। তাঁর মতে, একজন আইনজীবীর দক্ষতা, সততা কিংবা পেশাগত যোগ্যতা বয়স দিয়ে নির্ধারণ করা যায় না। আইন পেশার মানোন্নয়নে বয়সের বাধা আরোপের পরিবর্তে কঠোর পরীক্ষা, কার্যকর প্রশিক্ষণ এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করাই বেশি জরুরি।
মেলবোর্নের এসআর লইয়ার্সের ব্যারিস্টার ও সলিসিটর নুরুল খান বলেন, বাংলাদেশে ২০৩০ সাল থেকে আইন পেশায় তালিকাভুক্তির সর্বোচ্চ বয়সসীমা ৩৫ বছর নির্ধারণের সিদ্ধান্তটি গভীরভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। আইন পেশার মানোন্নয়ন এবং পেশাগত শৃঙ্খলা বজায় রাখার উদ্দেশ্য যৌক্তিক হলেও শুধু বয়সের ভিত্তিতে যোগ্যতা নির্ধারণ করা ন্যায়সংগত নয়।
তাঁর মতে, ৩৬ বছর বয়সী একজন যোগ্য প্রার্থী আইন পেশায় প্রবেশের সুযোগ হারাতে পারেন, অথচ ৩৪ বছর বয়সী অপেক্ষাকৃত অযোগ্য প্রার্থী সেই সুযোগ পেতে পারেন। বয়সের এই পার্থক্য কোনো ব্যক্তির সততা, দক্ষতা, বিচারবোধ কিংবা পেশাগত যোগ্যতার প্রমাণ হতে পারে না।
দারিদ্র্য, পারিবারিক দায়িত্ব কিংবা অন্য পেশায় যুক্ত থাকার কারণে অনেকের আইনশিক্ষা সম্পন্ন করতে দেরি হতে পারে। এসব ব্যক্তিকে শুধু বয়সের কারণে অযোগ্য বিবেচনা করা উচিত নয়। একইভাবে আগে সরকারি দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের প্রভাব বা ক্ষমতার অপব্যবহার নিয়ে উদ্বেগ থাকলে তা স্বাধীনভাবে তদন্ত করে প্রমাণের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। একটি নির্দিষ্ট বয়সের সব আবেদনকারীকে সন্দেহের চোখে দেখা সমস্যার সমাধান নয়।
সংবিধান ও আইনি ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন
বাংলাদেশের সংবিধানের ২৭, ৩১ ও ৪০ অনুচ্ছেদের প্রসঙ্গ তুলে ধরে নুরুল খান বলেন, সংবিধান আইনের দৃষ্টিতে সমতা, আইনি সুরক্ষা এবং আইনসম্মত পেশায় প্রবেশের অধিকার নিশ্চিত করেছে। তবে আইন পেশায় প্রবেশের জন্য কঠোর যোগ্যতার শর্ত নির্ধারণে বাধা নেই। কোনো নির্দিষ্ট বয়সসীমা আরোপ করা হলে তার প্রয়োজনীয়তা ও যৌক্তিকতা যথাযথভাবে ব্যাখ্যা করতে হবে।
বাংলাদেশ লিগ্যাল প্র্যাকটিশনার্স অ্যান্ড বার কাউন্সিল অর্ডার, ১৯৭২-এর ২৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী আইন পেশায় প্রবেশের ন্যূনতম বয়স ২১ বছর। একই সঙ্গে পরীক্ষা, প্রশিক্ষণ এবং অন্যান্য শর্ত পূরণের বিধান রয়েছে। এ ছাড়া একই আদেশের ৪০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বিধিমালা প্রণয়নের ক্ষেত্রে সরকারের পূর্বানুমোদন ও গেজেট প্রকাশের প্রয়োজনীয়তার কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
বাংলাদেশ বার কাউন্সিল বনাম এ কে এম ফজলুল করিম মামলায় ২০১৭ সালে দেওয়া রায়ের প্রসঙ্গ তুলে ধরে নুরুল খান বলেন, বিধিমালার মাধ্যমে আইনজীবী তালিকাভুক্তির বয়স নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা স্বীকৃত হলেও এর অর্থ এই নয় যে ৩৫ বছর বয়সসীমা নির্ধারণের যৌক্তিকতা স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট রায়, বিধিমালা এবং বয়সসীমা নির্ধারণের পক্ষে প্রমাণ প্রকাশ করা প্রয়োজন।
ভারত, ইংল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়ার উদাহরণ
আন্তর্জাতিক উদাহরণ তুলে ধরে নুরুল খান বলেন, ১৯৯৫ সালে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট আইন পেশায় প্রবেশের ক্ষেত্রে ৪৫ বছরের সর্বোচ্চ বয়সসীমা বাতিল করেন। আদালত বয়সের ভিত্তিতে অযৌক্তিক সাধারণীকরণ ও সমতার নীতি লঙ্ঘনের বিষয়টি বিবেচনায় নেন। তবে ভারতের ওই রায় বাংলাদেশের জন্য বাধ্যতামূলক নয়; তা থেকে নীতিগত শিক্ষা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
ইংল্যান্ড ও ওয়েলসের সলিসিটর কোয়ালিফাইং এক্সামিনেশন বা এসকিউই পদ্ধতিতে শিক্ষাগত যোগ্যতা, পরীক্ষা, কাজের অভিজ্ঞতা এবং পেশাগত উপযুক্ততার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
অস্ট্রেলিয়ার ভিক্টোরিয়া রাজ্যেও আইন পেশায় প্রবেশের ক্ষেত্রে শিক্ষা, ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ এবং পেশাগত উপযুক্ততা গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয়। এসব ব্যবস্থায় সাধারণভাবে ৩৫ বছরের সর্বোচ্চ বয়সসীমা নেই।
নুরুল খানের মতে, আন্তর্জাতিক এসব উদাহরণ থেকে বোঝা যায়, বয়সের সীমা আরোপ না করেও আইন পেশায় উচ্চমানের যোগ্যতা ও পেশাগত শৃঙ্খলা বজায় রাখা সম্ভব।
আইনজীবীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করার তাগিদ
আইনজীবীদের পেশাগত অনিয়ম মোকাবিলায় বিদ্যমান শৃঙ্খলামূলক ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করার ওপর গুরুত্ব দেন নুরুল খান। বাংলাদেশে আইনজীবীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গ্রহণ, তদন্ত, তিরস্কার, সাময়িক বরখাস্ত এবং অপসারণের আইনি ব্যবস্থা রয়েছে। তবে এসব ব্যবস্থা কতটা কার্যকর, স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষভাবে পরিচালিত হচ্ছে, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
তাঁর মতে, আইনজীবীদের জন্য তত্ত্বাবধানের অধীনে ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ ও নিয়মিত পেশাগত উন্নয়নের ব্যবস্থা জোরদার করা প্রয়োজন। স্বার্থের সংঘাত, গোপনীয়তা, মক্কেলের অর্থ ব্যবস্থাপনা, মামলা পরিচালনার ব্যয় এবং আদালতের প্রতি দায়িত্বের মতো বিষয়গুলোতে বাস্তবভিত্তিক মূল্যায়ন থাকা উচিত। পাশাপাশি প্রশিক্ষণ যেন ঢাকার বাইরের শিক্ষার্থীদের জন্যও সাশ্রয়ী ও সহজলভ্য হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে।
আইনজীবীদের পেশাগত দায়িত্ব ও নৈতিকতার মানদণ্ড হালনাগাদ করে সেগুলোর যথাযথ প্রয়োগের আহ্বান জানান তিনি। প্রমাণিত অসততা, গুরুতর অবহেলা কিংবা ধারাবাহিক অযোগ্যতার ক্ষেত্রে অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী শাস্তি নিশ্চিত করা প্রয়োজন বলে মনে করেন নুরুল খান। একই সঙ্গে জ্যেষ্ঠতা, রাজনৈতিক যোগাযোগ কিংবা পেশাগত প্রভাব যেন কোনো আইনজীবীকে তদন্ত ও জবাবদিহির বাইরে রাখতে না পারে, সে বিষয়েও গুরুত্ব দেন।
আইনজীবীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গ্রহণ, তদন্ত এবং শৃঙ্খলামূলক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য আইন করে একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠান গঠনের প্রস্তাব দেন তিনি। এ ক্ষেত্রে অস্ট্রেলিয়ার কুইন্সল্যান্ডের লিগ্যাল সার্ভিসেস কমিশনের উদাহরণ তুলে ধরেন।
তাঁর মতে, এমন প্রতিষ্ঠানে স্বচ্ছ নিয়োগপ্রক্রিয়া, সরকারি ও আইনজীবী পেশার প্রতিনিধিত্ব, সুরক্ষিত অর্থায়ন এবং নির্দিষ্ট মেয়াদে দায়িত্ব পালনের ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। তদন্ত ও অভিযোগ পরিচালনার কাজ বিচারিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া থেকে পৃথক রাখতে হবে। অভিযোগকারীদের নিয়মিত অগ্রগতি জানানো, নিরপেক্ষ শুনানি এবং বিচারিক তদারকিও নিশ্চিত করা জরুরি।
এ ছাড়া অভিযোগের সংখ্যা, নিষ্পত্তিতে বিলম্ব এবং শাস্তিমূলক ব্যবস্থার তথ্য প্রয়োজনীয় গোপনীয়তা বজায় রেখে প্রকাশের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
বয়স নয়, যোগ্যতা হোক মূল মানদণ্ড
নুরুল খান মনে করেন, আইন পেশায় প্রবেশের সুযোগ সীমিত করার আগে সংশ্লিষ্ট বিধিমালা, জনবল, তদন্তক্ষমতা এবং বাস্তবায়ন ব্যবস্থার দুর্বলতাগুলো স্বাধীনভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে বয়সসীমা আরোপের সম্ভাব্য প্রভাব মূল্যায়ন এবং বয়সের কারণে বাদ পড়া আবেদনকারীদের আইনগত প্রতিকার পাওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।
তাঁর মতে, বাংলাদেশের প্রয়োজন আরও দক্ষ, নৈতিক ও জবাবদিহিমূলক আইন পেশা। শুধু অপেক্ষাকৃত কম বয়সী আইনজীবী তৈরি করাই পেশার মানোন্নয়নের নিশ্চয়তা নয়। প্রত্যেক আবেদনকারীর যোগ্যতা কঠোরভাবে যাচাই এবং পেশায় নিয়োজিত প্রত্যেক আইনজীবীর জন্য কার্যকর পেশাগত মানদণ্ড নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত মূল লক্ষ্য।
আইন পেশায় বয়সের বাধা আরোপের পরিবর্তে যোগ্যতা, নৈতিকতা ও পেশাগত মান উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

