অস্ট্রেলিয়ার নারী ক্রিকেটের সোনালি অধ্যায়ের অনেকটা পথজুড়েই তাঁর উপস্থিতি। কখনো ব্যাট হাতে জয়ের নায়ক, কখনো উইকেটের পেছনে নির্ভরতার প্রতীক। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেটে নিজের নামটি প্রতিষ্ঠিত করেছেন বেথ মুনি। এবার সেই পথচলায় যোগ হতে যাচ্ছে শততম ওয়ানডের মাইলফলক।
অথচ নিজের অর্জনের চেয়েও মুনির ভাবনায় বড় জায়গা নিয়েছে ক্রিকেটের বদলে যাওয়া পৃথিবী। যে ক্রিকেটে একসময় মেয়েদের জন্য সুযোগ ছিল সীমিত, সেই ক্রিকেটই এখন নতুন প্রজন্মের স্বপ্ন দেখার জায়গা। অস্ট্রেলিয়ার সেই পরিবর্তনের সাক্ষী মুনি, আবার তার অন্যতম কারিগরও।
ব্রিসবেনের অ্যালান বর্ডার ফিল্ডে বাংলাদেশের বিপক্ষে সিরিজের শেষ ওয়ানডের আগে শোনা হলো দীর্ঘ ক্রিকেটযাত্রা, বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন, নতুন প্রজন্ম এবং নারী ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ। কথা হলো বাংলাদেশ দলকে নিয়েও। মুনির চোখে বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের সামর্থ্য আছে, তবে আধুনিক ওয়ানডে ক্রিকেটে আরও এগিয়ে যেতে হলে প্রয়োজন আক্রমণাত্মক মানসিকতা এবং নিজেদের সীমা ছাড়িয়ে যাওয়ার সাহস।
শততম ম্যাচের আগে মুনির কথোপকথনের নির্বাচিত অংশ তুলে ধরেছেন ব্রিসবেন থেকে হিমু আক্তার।
প্রশ্ন: বাংলাদেশের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে আপনার শততম ওয়ানডির মাইলফলক স্পর্শ করতে যাচ্ছেন। অস্ট্রেলিয়ার হয়ে ১০০ ওয়ানডে খেলার অনুভূতি কেমন?
বেথ মুনি: সত্যিই অসাধারণ অনুভূতি। নিজের ক্রিকেট জীবনের দিকে ফিরে তাকানোর একটা ভালো সুযোগ এটি। এই পথচলায় অনেক চ্যালেঞ্জ ছিল, আবার অসংখ্য আনন্দের মুহূর্তও ছিল। বিশ্বাস করতেই কষ্ট হয়, গত ১০–১১ বছরে ১০০টি ওয়ানডে ম্যাচ খেলার সুযোগ হয়েছে। এই সময়ে দল যা অর্জন করেছে, তা নিয়ে আমি গর্বিত। বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভিন্ন দলের সঙ্গে যে যাত্রার অংশ হয়েছি এবং সেই সাফল্যে নিজের ভূমিকা রাখতে পেরেছি, সেটাই আমার কাছে অনেক বড় ব্যাপার।
প্রশ্ন: বাংলাদেশের বিপক্ষে আগের ম্যাচে বাংলাদেশ দলের পারফরম্যান্স কেমন দেখেছেন? বিশ্ব ক্রিকেটের শীর্ষ পর্যায়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে তাদের কোন জায়গায় উন্নতি করা প্রয়োজন বলে মনে করেন?
বেথ মুনি: আমার মনে হয়েছে, সেদিন তারা সত্যিই ভালো খেলেছে। নারী ক্রিকেটে ৫০ ওভারের সংস্করণ এখন খুব দ্রুত বদলে যাচ্ছে। তাই খেলাটাকে আরও আক্রমণাত্মকভাবে নিতে হবে। নিজেদের সামর্থ্যের সীমা একটু বাড়াতে হবে এবং আরও সাহসী ক্রিকেট খেলতে হবে।
প্রশ্ন: ১০০ ওয়ানডের দীর্ঘ যাত্রায় কোন অর্জনকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেবেন?
বেথ মুনি: কঠিন প্রশ্ন। ২০১৭ থেকে ২০২২ সালের সময়টা আমার বিশেষভাবে মনে পড়ে। তখন আমরা ওয়ানডে বিশ্বকাপের শিরোপা ফিরে পাওয়ার জন্য কঠোর পরিশ্রম করছিলাম। বর্তমান সময়টাও কিছুটা সেই সময়ের মতো। বিশ্বকাপে হারের পর আমরা আবার পরবর্তী আসরের দিকে এগোচ্ছে।
এই সময়ে আমার কিছু ইনিংস আছে, যেগুলো প্রায় হেরে যাওয়া ম্যাচ জিততে সাহায্য করেছে। তবে নির্দিষ্ট একটি মুহূর্তকে সবচেয়ে গর্বের বলতে চাই না। বরং পুরো সময়জুড়ে দলের সাফল্যে অবদান রাখতে পারাটাই আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ।
প্রশ্ন: আপনার আন্তর্জাতিক অভিষেকের পর থেকে নারী ক্রিকেট কতটা বদলেছে বলে মনে করেন?
বেথ মুনি: গত ১০–১১ বছরে ক্রিকেট অনেক বদলে গেছে। ফিবি লিচফিল্ড ও জর্জিয়া ভলের মতো তরুণ ক্রিকেটাররা যেভাবে খেলছে, সেটা দেখাটা দারুণ ব্যাপার।
সবচেয়ে আনন্দের বিষয় হলো, এখন শুধু মেয়েরাই নয়, ছোট ছেলেরাও নারী ক্রিকেট দেখতে আসে। তারা বড় হচ্ছে এই ধারণা নিয়ে যে মেয়েদের ক্রিকেট খেলাটা একেবারেই স্বাভাবিক। অন্যদিকে মেয়েরা দেখতে পাচ্ছে, ক্রিকেট এখন তাদের পূর্ণকালীন পেশাও হতে পারে। এই পরিবর্তনের অংশ হতে পেরে আমি গর্বিত।
প্রশ্ন: আপনার ক্রিকেটের শুরুটা কোথায়? কখন মনে হয়েছিল ক্রিকেটকেই পেশা হিসেবে নিতে পারবেন?
বেথ মুনি: আমি প্রথম ব্যাট ধরেছিলাম ভিক্টোরিয়ার শেপার্টনে। পরে আমাদের পরিবার কুইন্সল্যান্ডে চলে আসে। হার্ভে বেতে স্কুল ক্রিকেটের সঙ্গে যুক্ত হই। সেখানে ক্রিস মিড নামে একজন শিক্ষক আমাকে অনেক উৎসাহ দিয়েছিলেন।
ছেলেদের সঙ্গেও অনেক ক্রিকেট খেলেছি। কিন্তু মেয়েদের সঙ্গে খেলার সুযোগ পাওয়াটা আমার জন্য বিশেষ আনন্দের ছিল। এরপর বিভিন্ন প্রতিনিধিত্বমূলক দলে সুযোগ পেতে শুরু করি। একসময় আমাকে বলা হয়েছিল, চাইলে ভবিষ্যতে অস্ট্রেলিয়ার হয়ে খেলতে পারব। সম্ভবত সেখান থেকেই বড় স্বপ্নের শুরু।
প্রশ্ন: বিশ্বকাপ হারানোর হতাশা কি আবার শিরোপা জয়ের জন্য আপনাকে অনুপ্রাণিত করছে?
বেথ মুনি: অবশ্যই। ভারতে বিশ্বকাপ হারানোর পর অনেক হতাশা ছিল। সামনে অনেক বড় প্রতিযোগিতা আছে। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ, চ্যাম্পিয়নস ট্রফি, অ্যাশেজসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিরিজ রয়েছে।
আমার লক্ষ্য আগামী কয়েক বছর এমন ক্রিকেট খেলা, যাতে পরবর্তী ওয়ানডে বিশ্বকাপের দলে জায়গা পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। একই সঙ্গে বদলে যাওয়া ওয়ানডে ক্রিকেটের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে চাই।
প্রশ্ন: ২০২৮ সালের লস অ্যাঞ্জেলেস অলিম্পিক এবং ভবিষ্যতের বড় প্রতিযোগিতাগুলো কি খেলোয়াড়দের দীর্ঘদিন ক্রিকেটে থাকার অনুপ্রেরণা দিচ্ছে?
বেথ মুনি: অবশ্যই। অলিম্পিক অনেক বড় আকর্ষণ। তবে খুব বেশি দূরের কথা ভাবলে মাঝে মাঝে চাপ তৈরি হয়। কারণ এখন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের পাশাপাশি ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটেও অনেক ব্যস্ততা।
নারী ক্রিকেট এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি পেশাদার এবং আর্থিকভাবেও উন্নত। ফলে খেলোয়াড়রা হয়তো আগের তুলনায় বেশি বয়স পর্যন্ত খেলবেন। তবে আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, আমি দলের সাফল্যে অবদান রাখতে পারছি কি না।
প্রশ্ন: ২০৩২ সালের অলিম্পিক পর্যন্ত খেলার কথা কি ভাবছেন?
বেথ মুনি: এখনই বলতে পারছি না। দেখা যাক। আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ হলো, আমি যে দলে খেলছি, সেই দলের সাফল্যে ইতিবাচক অবদান রাখতে পারছি কি না।
কয়েক বছর পরও যদি সেটা করতে পারি, তাহলে আশা করি তখনও খেলব। তবে এর মধ্যে অনেক ক্রিকেট বাকি। তরুণ ক্রিকেটারদের সাহায্য করাটাও আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ।
প্রশ্ন: দীর্ঘদিন ধরে ধারাবাহিকভাবে রান করার রহস্য কী?
বেথ মুনি: আমি চেষ্টা করি নিজের মানসিক অবস্থায় ভারসাম্য রাখতে। খুব বেশি উচ্ছ্বসিত হই না, আবার খারাপ সময়েও অতিরিক্ত হতাশ হই না।
আমার সাফল্যের পুরো কৃতিত্ব নিজের নয়। পরিবার, বন্ধু, কোচ এবং নির্বাচকদের অনেক অবদান রয়েছে। ম্যাথু মট, শেলি নিটশকে, ব্যাটিং কোচ ড্যান মার্শ এবং নির্বাচক শন ফ্লেগলারের কাছ থেকে অনেক সহযোগিতা পেয়েছি।
ক্রিকেট এমন একটি খেলা, যেখানে প্রতিবার মাঠে নেমে ভালো করা সম্ভব নয়। তাই খারাপ সময়েও নিজের স্থিরতা ধরে রাখতে হয়।
প্রশ্ন: ফিবি লিচফিল্ড ও জর্জিয়া ভলের মতো তরুণদের কাছ থেকেও কি নতুন কিছু শিখছেন?
বেথ মুনি: অবশ্যই। তারা যেভাবে ক্রিকেট খেলে, সেটা আমাদের মতো অভিজ্ঞ ক্রিকেটারদেরও নতুনভাবে ভাবতে সাহায্য করে।
জর্জিয়া ভল গত কয়েক মাসে আমার ব্যাটিং নিয়েও কিছু পরামর্শ দিয়েছে। এটাই আমাদের দলের পরিবেশের সবচেয়ে সুন্দর দিক। এখানে সবাই সবাইকে উন্নতি করতে সাহায্য করে। কেউ ১০০ ম্যাচ খেলুক কিংবা ২০ ম্যাচ, শেখার সুযোগ সবসময় থাকে।
প্রশ্ন: শততম ওয়ানডে ব্রিসবেনে, পরিচিত অ্যালান বর্ডার ফিল্ডে খেলতে পারাটা কতটা বিশেষ?
বেথ মুনি: নিজের শহরে খেলতে পারাটা অবশ্যই বিশেষ। আশা করছি পরিবারের কয়েকজন সদস্য এবং বন্ধুরা মাঠে থাকবে। এখানে আমি ক্যারিয়ারের অনেকটা সময় খেলেছি। তাই পরিচিত এই মাঠে এমন একটি ম্যাচ খেলতে পারা সত্যিই আনন্দের।
প্রশ্ন: নারী ক্রিকেটের ম্যাচে দর্শক উপস্থিতি বাড়াতে সূচিতে কী ধরনের পরিবর্তন প্রয়োজন?
বেথ মুনি: আমার মনে হয় স্কুলের ছুটির সময়ে আরও বেশি ম্যাচ আয়োজন করা দরকার। ডিসেম্বর মাসে দেশের মাটিতে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের জন্য একটি নির্দিষ্ট সময় রাখা যেতে পারে। আবার পুরুষ ও নারী বিগ ব্যাশের সূচির মধ্যেও কিছু সমন্বয় করা সম্ভব।
গত শুক্রবার এখানে মাত্র প্রায় ৭০০ দর্শক ছিল। ব্রিসবেনের একজন স্থানীয় হিসেবে বিষয়টি কিছুটা হতাশাজনক। তবে স্কুল ও কাজের সময়ে মানুষকে মাঠে আনা কঠিন, সেটাও বুঝতে হবে। খেলোয়াড় হিসেবে আমাদের দায়িত্ব নতুন প্রজন্মকে ক্রিকেটের প্রতি আগ্রহী করা। কিন্তু দর্শকদের মাঠে আসার সুযোগও সহজ করতে হবে।
প্রশ্ন: অবসরের পর ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার বোর্ডে কাজ করার আগ্রহ আছে?
বেথ মুনি: একেবারেই না! সেটা আমার সামর্থ্যের অনেক বাইরের ব্যাপার বলে মনে হয়। তবে ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণে সংশ্লিষ্ট সবার মতামত থাকা জরুরি।
আমি যখন মাঠে নেমে গ্যালারিতে ছোট ছেলে-মেয়েদের দেখি, তখন মনে হয় আমরা আমাদের কাজটা ভালোভাবেই করছি। শুধু আরও কিছু সহযোগিতা প্রয়োজন, যাতে ক্রিকেটকে সবার কাছে পৌঁছে দেওয়া যায়।

