উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও অর্থনৈতিক মন্দার প্রভাবে বিশ্বের সবচেয়ে বড় তৈরি পোশাকের বাজার যুক্তরাষ্ট্রে সার্বিক আমদানিতে বড় ধরনের ধস নেমেছে। মার্কিন অফিশিয়াল ডেটা ও টেক্সটাইল সংক্রান্ত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে বিশ্ববাজার থেকে দেশটির পোশাক আমদানি কমেছে আট শতাংশের বেশি।
তবে এই বিশ্বব্যাপী মন্দা ও বাজার সংকোচনের মধ্যেও মার্কিন বাজারে নিজেদের শক্ত অবস্থান ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে বাংলাদেশ।
চীন ও ভারতের বড় পতন, বাংলাদেশের ইতিবাচক ঘুরে দাঁড়ানো
অফিস অব টেক্সটাইল অ্যান্ড অ্যাপারেলস (OTEXA)-এর সংগৃহীত তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে মার্কিন বাজারে শীর্ষ পোশাক রপ্তানিকারক দেশগুলোর বড় ধরনের পতন ঘটেছে। এ সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে চীনের তৈরি পোশাক রপ্তানি সাড়ে ৩৭ শতাংশের বেশি কমেছে। ভারতের ক্ষেত্রে এই পতনের হার ২৫ শতাংশের উপরে।
অন্যদিকে, বড় দুই প্রতিযোগী দেশের তুলনায় বাংলাদেশের রপ্তানি পতন ছিল মাত্র ৫.৭৫ শতাংশ। আরও স্বস্তির খবর হলো—বছরের প্রথম দিকে খানিকটা নেতিবাচক ধারা থাকলেও গত জুন মাসে বাংলাদেশ ফের পৌনে ৬ শতাংশ (৫.৭৪%) ইতিবাচক প্রবৃদ্ধিতে ফিরে এসেছে।
আস্থা ধরে রেখেছে বাংলাদেশ
শুধু রপ্তানির অর্থমূল্যেই নয়, পরিমাণের দিক থেকেও যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে নিজেদের দ্বিতীয় বৃহত্তম অবস্থান ও বিশাল শেয়ার ধরে রেখেছে বাংলাদেশ। বিশ্বজুড়ে পোশাকের চাহিদা কমায় অনেক প্রতিদ্বন্দ্বী দেশ বড় অঙ্কের মূল্যছাড় (Discounting) দিয়ে অর্ডার ধরে রাখার চেষ্টা করলেও, বাংলাদেশের পণ্যের দর ধরে রাখার সক্ষমতা ছিল বেশ প্রশংসনীয়। আন্তর্জাতিক ক্রেতা ও মার্কিন ব্র্যান্ডগুলোর এ দেশের তৈরি পোশাক খাতের ওপর তৈরি হওয়া গভীর আস্থারই বহিঃপ্রকাশ বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।
সম্ভাবনার দুয়ার খুলছে ‘টিআরকিউ’ সুবিধা
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে নতুন আশা জাগাচ্ছে দেশটির সম্ভাব্য ‘ট্যালিফ রেট কোটা’ (TRQ) সুবিধা। প্রস্তাবিত এই ব্যবস্থার আওতায় মার্কিন তুলা ও টেক্সটাইল কাঁচামাল ব্যবহার করে তৈরি পোশাকের ওপর অতিরিক্ত শুল্ক ছাড় দেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র সরকারের প্রাথমিক তালিকায় বাংলাদেশ, কম্বোডিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ার নাম থাকলেও প্রধান দুই প্রতিযোগী চীন ও ভারত এতে স্থান পায়নি। ফলে এই টিআরকিউ সুবিধা চূড়ান্ত হলে মার্কিন বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বহুলাংশে বেড়ে যাবে।
সামনের চ্যালেঞ্জ ও করণীয়
রপ্তানিকারক ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, বিশ্ববাজারের বৈরী আবহাওয়া কাটিয়ে উঠলেও সম্ভাবনাকে পুরোপুরি কাজে লাগাতে দেশের অভ্যন্তরে কিছু জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন:
জ্বালানি সংকট নিরসন: তৈরি পোশাক কারখানায় নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা।
উৎপাদন খরচ নিয়ন্ত্রণ: লজিস্টিকস ও অতিরিক্ত উৎপাদন ব্যয় কমিয়ে আনা।
বাণিজ্য কূটনীতি: যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কার্যকর বাণিজ্য কূটনীতি জোরদার করে প্রস্তাবিত টিআরকিউ ও অন্যান্য শুল্ক সুবিধা দ্রুত বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা।
সঠিক নীতিগত সহায়তা ও কৌশলী পদক্ষেপ অব্যাহত থাকলে মার্কিন বাজারে চলমান বিশ্ব মন্দার ধাক্কা সামলে বাংলাদেশ দ্রুতই পোশাক রপ্তানিতে নতুন রেকর্ড গড়বে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।

