যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বখ্যাত প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান NVIDIA বাংলাদেশি সিনিয়র এআই গবেষক ইরফান আল-হুসাইনির (৩২) আকস্মিক ও রহস্যজনক মৃত্যুকে ঘিরে তৈরি হয়েছে গভীর শোক ও ক্ষোভ। স্থানীয় পুলিশের ‘আত্মহত্যা’র দাবি প্রত্যাখ্যান করে বিচার চেয়েছে ক্যালিফোর্নিয়ায় বসবাসরত পরিবার। একই সঙ্গে ক্যালিফোর্নিয়া অ্যাটর্নি জেনারেলের দরবারে জরুরি আবেদন জানিয়ে বাংলাদেশি প্রবাসী কমিউনিটি ও বুয়েট অ্যালামনাই লাশের দাহকাজ (Cremation) অবিলম্বে বন্ধের দাবি তুলেছেন।
ঘটনাস্থল ক্যালিফোর্নিয়ার পালো আল্টোর প্রবাসী সমাজে এখন একটিই প্রশ্ন বুয়েট ও জর্জিয়া টেক থেকে পিএইচডি করা এই উদীয়মান বিশ্বমানের বিজ্ঞানী কি সত্যিই আত্মহত্যা করেছেন, নাকি আড়ালে রয়ে গেছে অন্য কোনো সত্য?
রহস্যজনক পরিস্থিতি ও প্রবাসী পরিবারের প্রশ্ন
পরিবারের পক্ষ থেকে এই মৃত্যুকে কেন্দ্র করে যেসব চাঞ্চল্যকর বৈপরীত্য তুলে ধরা হয়েছে, তাতে তদন্ত প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে মার্কিন প্রবাসী সমাজ তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করেছে:
-
স্বাভাবিক কর্মদিবস: ঘটনার দিন সকালেও অত্যন্ত প্রফুল্ল চিত্তে অফিসে গুরুত্বপূর্ণ এআই প্রজেক্টের প্রেজেন্টেশন সম্পন্ন করেন ইরফান। এর ঠিক ৯০ মিনিটের মাথায় নিজ বাসায় তাঁকে অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করা হয়।
-
সন্দেহজনক মেসেজ: প্রেজেন্টেশনের পরপরই দলগত মেসেঞ্জারে জানানো হয় যে তাঁর স্ত্রী অসুস্থ থাকায় তিনি ছুটি নিচ্ছেন। এর পরপরই জরুরি সেবা ৯১১-এ কল আসে।
-
মরদেহ দাহ করার তোড়জোর: পরিবারের ইচ্ছা ও ইসলামিক রীতিনীতির বিরুদ্ধে গিয়ে তড়িঘড়ি করে মরদেহ দাহ করার তোড়জোর শুরু হলে চরম আইনি জটিলতার সৃষ্টি হয়।
-
ফরেনসিক আলামত ধ্বংসের আশঙ্কা: স্বজনদের দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় আইন অনুযায়ী দাহ করা হলে সব ধরনের শারীরিক আলামত ও বিষক্রিয়ার (Toxicology) ফরেনসিক পরীক্ষা চিরতরে বন্ধ হয়ে যাবে, যা ন্যায়বিচারের পথ রুদ্ধ করবে।
স্যাক্রামেন্টো ও ক্যালিফোর্নিয়ায় রাষ্ট্রদূত ও প্রবাসীদের দৌড়ঝাঁপ
ইরফানের বোন সারাহ আল-হুসাইনি এবং প্রবাসীদের পক্ষ থেকে ক্যালিফোর্নিয়ার অ্যাটর্নি জেনারেল রব বোন্টার কার্যালয়ে একটি আনুষ্ঠানিক অভিযোগ ও জরুরি পিটিশন জমা দেওয়া হয়েছে। লাশের ওপর ‘ফরেনসিক হোল্ড’ বা আইনি স্থগিতাদেশ জারি করাই এখন তাদের প্রধান লক্ষ্য।
একই সঙ্গে ওয়াশিংটনে বাংলাদেশ দূতাবাস এবং ক্যালিফোর্নিয়ায় কনস্যুলেট জেনারেলের মাধ্যমে বিষয়টি সান্তা ক্লারা কাউন্টির ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নি ও পুলিশের নজরে আনা হয়েছে।
এক বিজ্ঞপ্তিতে ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নির কার্যালয় নিশ্চিত করেছে যে, পালো আল্টো পুলিশ ও সান্তা ক্লারা কাউন্টি মেডিকেল এক্সামিনারের ফরেনসিক প্যাথলজিস্ট স্বতন্ত্র তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছেন। চিকিৎসায় অসঙ্গতি বা হত্যাকাণ্ডের কোনো প্রমাণ পাওয়া গেলে মামলাটিকে নতুন আইনি ধারায় পর্যালোচনার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
প্রবাসে প্রদীপের মতো জ্বলে ওঠা এক মেধার অকাল প্রস্থান
ইরফান আল-হুসাইনি ছিলেন বাংলাদেশের একজন খাঁটি রত্ন। বুয়েট থেকে পড়াশোনা শেষে জর্জিয়া টেক থেকে ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পিএইচডি সম্পন্ন করে তিনি বিশ্বসেরা চিপমেকার ‘নেভিডিয়া’তে যোগ দেন। চিকিৎসা বিজ্ঞানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার ও ‘ব্যাখ্যাযোগ্য এআই’ (XAI) নিয়ে তাঁর উদ্ভাবনী গবেষণা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রশংসিত হয়েছিল।
একজন প্রতিভাবান বাংলাদেশি প্রবাসীর প্রবাসের মাটিতে এভাবে অকালে চলে যাওয়া এবং মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনে আইনি বাধা—আমেরিকা থেকে শুরু করে বিশ্বজুড়ে অবস্থানরত উত্তরপ্রজন্মের প্রবাসীদের মনকে গভীরভাবে আলোড়িত করেছে। পরিবারের সঙ্গে সুর মিলিয়ে পুরো প্রবাসী নেটওয়ার্ক এখন কেবল একটিই দাবি জানাচ্ছে নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও বিচার বিভাগীয় পুনঃতদন্ত।

