সূর্য, চাঁদ ও পৃথিবী যখন একই সরলরেখায় অবস্থান করে, তখন চাঁদের ছায়া পৃথিবীর ওপর পড়ে এবং ঘটে মহাজাগতিক বিস্ময় ‘সূর্যগ্রহণ’। এটি কেবল একটি দৃশ্যমান মহাজাগতিক সৌন্দর্যই নয়, বিজ্ঞানীদের জন্য সূর্যের বায়ুমণ্ডল ও সৌরবায়ু গবেষণার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক সময়।
আজ (১২ আগস্ট) পৃথিবীর বেশ কিছু অঞ্চলে পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ দৃশ্যমান হচ্ছে, যার পূর্ণতার পথ অতিক্রম করছে গ্রিনল্যান্ড, আইসল্যান্ড, উত্তর রাশিয়া, আটলান্টিক মহাসাগর, স্পেন এবং উত্তর-পশ্চিম পর্তুগালের ওপর দিয়ে।
বিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে সূর্যগ্রহণ সম্পর্কে যে ১০টি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জেনে রাখা প্রয়োজন:
১. কীভাবে ঘটে সূর্যগ্রহণ?
চাঁদ যখন পৃথিবী ও সূর্যের ঠিক মাঝখানে চলে আসে এবং তার ছায়া পৃথিবীতে পড়ে, তখনই সূর্যগ্রহণ হয়। সূর্যের পুরো অংশ ঢাকা পড়লে তাকে পূর্ণগ্রাস এবং আংশিক ঢাকা পড়লে আংশিক সূর্যগ্রহণ বলা হয়।
২. চাঁদ ছোট হয়েও সূর্যকে ঢাকে কীভাবে?
সূর্য চাঁদের চেয়ে প্রায় ৪০০ গুণ বড় হলেও কাকতালীয়ভাবে পৃথিবী থেকে সূর্যের দূরত্বও চাঁদের দূরত্বের চেয়ে প্রায় ৪০০ গুণ বেশি। এই বিশেষ দূরত্বের অনুপাতের কারণেই পৃথিবী থেকে চাঁদ ও সূর্যকে প্রায় একই আকারের দেখায় এবং চাঁদ সূর্যকে পুরোপুরি ঢেকে ফেলতে পারে।
৩. গ্রহণের ধরন ভিন্ন হয়
সূর্যগ্রহণ মূলত চার ধরনের—পূর্ণগ্রাস, আংশিক, বলয়গ্রাস ও হাইব্রিড। বলয়গ্রাসের সময় চাঁদের চারপাশে সূর্যের আলোর একটি রিং দেখা যায়, যাকে ‘রিং অব ফায়ার’ বলা হয়।
৪. সূর্যগ্রহণে স্পষ্ট হয় ‘করোনা’
সূর্যের বাইরের বায়ুমণ্ডলকে বলা হয় ‘করোনা’। স্বাভাবিক দিনে অতিরিক্ত আলোর কারণে এটি দেখা না গেলেও, পূর্ণগ্রাস গ্রহণের সময় সূর্যের মূল চাকতি ঢাকা পড়লে চারপাশে এটি সাদা আলোর মুকুটের মতো দৃশ্যমান হয়।
৫. করোনার রহস্যময় তাপমাত্রা
সূর্যের দৃশ্যমান পৃষ্ঠের তাপমাত্রা প্রায় ৫,৫০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস হলেও, বাইরের ‘করোনা’র তাপমাত্রা লাফিয়ে উঠে প্রায় ২০ লাখ ডিগ্রি সেলসিয়াসে! সৌরবিজ্ঞানে এটি এখনও একটি অন্যতম বড় রহস্য।
৬. দিনের আলোতেই গোধূলির অন্ধকার
পূর্ণগ্রাসের সময় চাঁদের ছায়া পড়া অঞ্চলগুলোতে মুহূর্তেই দিনের আলো কমে আসে। প্রকৃতিতে ভোর বা গোধূলির মতো আমেজ তৈরি হয় এবং স্থানভেদে দ্রুত তাপমাত্রা কয়েক ডিগ্রি কমে যেতে পারে।
৭. প্রাণীকুলের আচরণে পরিবর্তন
হঠাৎ আলো কমে যাওয়ায় প্রাণীদের আচরণে বিভ্রম তৈরি হয়। পাখিরা রাত মনে করে বাসায় ফিরতে শুরু করে এবং অনেক নিশাচর প্রাণী নির্ধারিত সময়ের আগেই সক্রিয় হয়ে ওঠে।
৮. দিনেই দেখা মেলে গ্রহ-নক্ষত্রের
গ্রহণকালে আকাশ অন্ধকার হয়ে যাওয়ার ফলে খালি চোখে বা কম আলোতেও দিনের বেলা আকাশে উজ্জ্বল কিছু গ্রহ ও নক্ষত্রের দেখা পাওয়া সম্ভব হয়।
৯. স্থায়িত্বকাল খুব সংক্ষিপ্ত
কোনো নির্দিষ্ট স্থান থেকে পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ বেশিক্ষণ স্থায়ী হয় না। পূর্ণতার পর্ব সাধারণত মাত্র কয়েক মিনিট থাকে। আজকের (১২ আগস্ট) গ্রহণেও অধিকাংশ স্থানে পূর্ণগ্রাসের সময়কাল ছিল দুই মিনিটের কম।
১০. গবেষণায় বিজ্ঞানীদের বিশেষ সুযোগ
সূর্যের প্রচণ্ড আলো আড়াল হওয়ায় বিজ্ঞানীরা গ্রহণের সময় ‘করোনা’ এবং সৌরবায়ুর গতিবিধি নিখুঁতভাবে পর্যবেক্ষণ ও গবেষণার বিরল সুযোগ পান।
চোখের নিরাপত্তার সতর্কতা:
পূর্ণগ্রাস গ্রহণের বিশেষ কিছু মুহূর্ত ছাড়া কখনই খালি চোখে বা সাধারণ চশমা পরে সূর্যের দিকে তাকানো উচিত নয়। গ্রহণ দেখতে সব সময় অনুমোদিত সোলার ফিল্টার বা বিশেষ সোলার গ্লাস ব্যবহার করা বাধ্যতামূলক।

