গত ২২ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় সিঙ্গাপুর থেকে আসা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটের টয়লেটের ভেতরে লুকানো অবস্থায় ১১ কোটি টাকা মূল্যের ৫০টি স্বর্ণবার উদ্ধার করে শুল্ক গোয়েন্দা। এর আগে মার্চে দুবাই থেকে আসা অপর একটি ফ্লাইটের কার্গো কম্পার্টমেন্টের টয়লেট থেকে ১৮ কেজির ১৫৩টি স্বর্ণবার উদ্ধার করা হয়।
বারবার বিমানেই সংরক্ষিত স্থানে সোনা পাচারের ঘটনা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। উড়োজাহাজের যাত্রীদের চলাচলের বাইরে এমন সংবেদনশীল স্থানে স্বর্ণ লুকিয়ে রাখার ঘটনায় সংশ্লিষ্টদের মধ্যে অনেকেই মজা করে বলছেন—বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স যেন পাচারকারীদের কাছে ‘স্বর্ণের খনি’ হয়ে উঠেছে।
বিমানকর্মী সজিবের ১৪ কেজি সোনা নিয়ে পালানোর চেষ্টা
সম্প্রতি ৫ সেপ্টেম্বর দুবাই থেকে চট্টগ্রাম হয়ে আসা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে বিশেষ নজরদারি চালিয়ে মোহাম্মদ সোয়েব গাজী সজিব নামের এক টেকনিক্যাল হেলপারকে (কারিগরি সহকারী) আটক করা হয়।
-
চালানের বিবরণ: সজিবের বেল্টের ভেতর লুকানো ছিল ১২০টি স্বর্ণের বার, যার মোট ওজন ১৩ কেজি ৯৯২ গ্রাম (প্রায় ১৪ কেজি) এবং বাজারমূল্য প্রায় ২৫ কোটি ২০ লাখ টাকা।
-
আটকের ঘটনা: বিমানবন্দরের নিরাপত্তারক্ষীদের দেখে সজিব প্যাকেট ছুড়ে ফেলে পালানোর চেষ্টা করলে তাকে ধাওয়া করে গ্রেপ্তার করা হয়।
বিমানের নিরাপত্তা বিভাগের মহাব্যবস্থাপক মেজর ফারহান তানভির জানান, “আমাদের নিরাপত্তা জোরদার করার কারণেই এসব সোনা উদ্ধার ও কর্মী আটক সম্ভব হচ্ছে। তবে লোভের বশবর্তী হয়ে কেউ এমন অপরাধ করলে তার ব্যক্তিগত দায় প্রতিষ্ঠান নেবে না।”
বিমানকে চোরাচালানের প্রধান টার্গেট করার নেপথ্যে
গোয়েন্দা সূত্র জানায়, উড়োজাহাজের যেসব স্থান সচরাচর তল্লাশি চালানো কঠিন, সেগুলোকে পাচারের প্রধান পথ হিসেবে বেছে নেয় সিন্ডিকেট:
১. প্যানেল বক্স: কার্গো হোলের প্যানেল বক্সগুলোকে নিরাপদ মনে করা হয়, যেখানে ইউটিলিটি পাইপ সংবেদনশীল আউটলেট থাকে। এখানে টেকনিশিয়ান ও ইঞ্জিনিয়ার ছাড়া সাধারণ কারও প্রবেশের সুযোগ নেই।
২. টয়লেট ও সিটের নিচে: ইংলিশ কমোডের পার্শ্ববর্তী স্থান, লুকিং গ্লাসের পেছন, গ্যাস মাস্ক সকেট এবং যাত্রী আসনের নিচে কৌশল করে সোনা লুকানো হয়।
শুল্ক গোয়েন্দাদের ধারণা, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে তল্লাশি চালিয়ে যে চালানগুলো ধরা পড়ছে, তার বাইরেও তথ্য না থাকলে বহু চালান বিমানের কর্মীদের সহায়তায় হ্যাঙ্গারে নিয়ে নিরাপদে বের করে নিয়ে যাচ্ছে শক্তিশালী এই সিন্ডিকেট।
১০ বছরে ৬৯৭ মামলা, শিকড় উপড়ানো নিয়ে শঙ্কা
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত পাঁচ অর্থবছরে দেশে অন্তত ১,৯০৬ কেজি স্বর্ণ জব্দ করা হয়েছে, যার বড় একটি অংশ ধরা পড়েছে বিমানের ফ্লাইটগুলোতে। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থানার তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত সাড়ে ১০ বছরে স্বর্ণ চোরাচালান-সংক্রান্ত ৬৯৭টি মামলা হয়েছে।
শুল্ক গোয়েন্দা বিভাগের সহকারী পরিচালক কাজী আল মাসুম বলেন, “অন্যান্য এয়ারলাইন্সের চেয়ে বিমানে স্বর্ণ চোরাচালানের মাত্রা বেশি। সামান্য টাকার লোভে বিমানের কিছু কর্মী এই অপকর্মে জড়িয়ে নিজের পাশাপাশি পুরো প্রতিষ্ঠানকে প্রশ্নের মুখোমুখি করছেন।”

