মালয়েশিয়ায় দ্বিতীয় নিবাস গড়ার প্রবণতা বাংলাদেশিদের মধ্যে ক্রমেই বাড়ছে। দেশটির ‘মাই সেকেন্ড হোম’ (এমএম২এইচ) কর্মসূচির আওতায় ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত মোট তিন হাজার ৬০৪ জন বাংলাদেশি স্থায়ীভাবে বসবাসের সুযোগ পেয়েছেন। সর্বশেষ সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মোট ৫৮ হাজার ৪৬৮ জন নাগরিক এই কর্মসূচির মাধ্যমে মালয়েশিয়ায় সেকেন্ড হোম গড়েছেন।
মালয়েশিয়ার পর্যটন, শিল্প ও সংস্কৃতি মন্ত্রী দাতুক সেরি তিওং কিং সিন গত ৯ মার্চ এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, এমএম২এইচ কর্মসূচি বিশ্বের যেকোনো দেশের আবেদনকারীদের জন্য উন্মুক্ত। এই প্রোগ্রামের মাধ্যমে বিদেশিরা নির্দিষ্ট যোগ্যতার মানদণ্ড পূরণ সাপেক্ষে বসবাসের জন্য আবেদন করতে পারেন এবং সফল আবেদনকারীরা একটি নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য রেসিডেন্স পাস পেয়ে থাকেন। এর আগে গত ২৪ ফেব্রুয়ারি সংসদে মন্ত্রী জানান, পূর্বের নীতির আওতায় মোট ৫৭ হাজার ৬৮৬টি অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল, যার মধ্যে ২৮ হাজার ২০৯ জন মূল আবেদনকারী এবং ২৯ হাজার ৪৭৭ জন ডিপেন্ডেন্ট ছিলেন।
নতুন নীতির আওতায় এখন পর্যন্ত ৭৮২টি অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে ৩১৯ জন মূল আবেদনকারী এবং ৪৬৩ জন ডিপেন্ডেন্ট রয়েছেন। মন্ত্রী তিওং আরও জানান, নতুন শর্তাবলির অধীনে অনুমোদিত পাসধারীদের কাছ থেকে সরকার আনুমানিক ২৩৩.৮ মিলিয়ন রিঙ্গিত স্থায়ী আমানত এবং ২২২ মিলিয়ন রিঙ্গিত রিয়েল এস্টেট খাতে বিনিয়োগ পেয়েছে।
২০২৩ সালের জুন মাসে মালয়েশিয়া সরকার এই কর্মসূচির জন্য নতুন নির্দেশিকা প্রকাশ করে। এতে সিলভার, গোল্ড এবং প্লাটিনাম—এই তিনটি ক্যাটাগরি নির্ধারণ করা হয়েছে। এছাড়া বিশেষ অর্থনৈতিক ও আর্থিক অঞ্চলের জন্য আলাদা ক্যাটাগরি রয়েছে। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, আবেদনকারীর বয়স কমপক্ষে ২৫ বছর হতে হবে এবং বছরে অন্তত ৯০ দিন মালয়েশিয়ায় অবস্থান করতে হবে। বিনিয়োগের ক্ষেত্রে প্লাটিনাম ক্যাটাগরিতে ১০ লাখ মার্কিন ডলার, গোল্ডে ৫ লাখ এবং সিলভার ক্যাটাগরিতে ১ লাখ ৫০ হাজার মার্কিন ডলার স্থায়ী আমানত বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। পাশাপাশি ভিসা ক্যাটাগরি অনুযায়ী ৬ লাখ থেকে ২০ লাখ রিঙ্গিত মূল্যের সম্পত্তি কেনার শর্তও জুড়ে দেওয়া হয়েছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত সাত বছরে মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশিদের সংখ্যা প্রায় ২৪ গুণ বেড়েছে। দেশটিতে বর্তমানে প্রায় ১৫ লাখ বাংলাদেশি বসবাস করছেন। মালয়েশিয়া বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্সের সদস্য ডা. শংকর পোদ্দার বলেন, যারা সেকেন্ড হোমে যুক্ত হয়েছেন, তারা মূলত নিজের ও বিনিয়োগের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তিনি মনে করেন, কেন মানুষ দেশ ছেড়ে অন্য দেশে স্থায়ী হচ্ছে, তা সরকারকে গভীরভাবে অনুধাবন করতে হবে।
তবে এই কর্মসূচিতে বাংলাদেশিদের অংশগ্রহণ নিয়ে নানা বিতর্ক রয়েছে। অভিযোগ আছে, দেশ থেকে অবৈধ উপায়ে অর্জিত অর্থ বা পাচার করা টাকা দিয়ে অনেকে মালয়েশিয়ায় ফ্ল্যাট বা বাড়ি কিনছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক প্রবাসী বাংলাদেশি জানান, মালয়েশিয়ায় সেকেন্ড হোমের জন্য ব্যবসায়ীদের অনেক সুবিধা দেওয়া হয়। অনেকে দেশের অস্থিরতা থেকে বাঁচতে বা সম্পদ নিরাপদ রাখতে এই পথ বেছে নিয়েছেন। এছাড়া মালয়েশিয়ার শিক্ষা ও উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থাও বাংলাদেশিদের আকৃষ্ট করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, মালয়েশিয়া সেকেন্ড হোম কর্মসূচিতে অর্থের উৎস নিয়ে কঠোর প্রশ্ন করে না, যা বাংলাদেশিদের জন্য একটি সুযোগ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশে ফ্ল্যাট কিনতে গেলে অর্থের উৎস জানাতে হয়, কিন্তু মালয়েশিয়ায় সেই বাধ্যবাধকতা নেই। ফলে অবৈধ আয় বা অর্থের উৎস জানাতে অক্ষম ব্যক্তিরা হুন্ডির মাধ্যমে টাকা পাচার করে সেখানে বিনিয়োগ করছেন। যদিও কিছু বাংলাদেশি বৈধভাবেও এই সুবিধা নিচ্ছেন, তবে সামগ্রিকভাবে দেশের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
মালয়েশিয়ায় বর্তমানে কয়েক হাজার বাংলাদেশি রেস্টুরেন্ট ব্যবসার পাশাপাশি পাঁচতারা হোটেল, গার্মেন্ট কারখানা, ওষুধশিল্প ও কৃষি খাতে বিপুল বিনিয়োগ করেছেন। কুয়ালালামপুরসহ বড় বড় শপিংমলে দোকান কেনা থেকে শুরু করে স্বর্ণ ও তৈরি পোশাকের ব্যবসায়ও বাংলাদেশিদের বড় উপস্থিতি রয়েছে। তবে এর বেশিরভাগই বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন ছাড়া হয়েছে। একসময় সেকেন্ড হোম কর্মসূচিতে বাংলাদেশিদের অবস্থান তৃতীয় থাকলেও বর্তমানে তা চতুর্থ স্থানে নেমে এসেছে। বিশ্লেষকরা মনে করেন, বিদেশে টাকা পাচার রোধে সরকারকে আইনের প্রয়োগ আরও কঠোর করতে হবে, কারণ অতীতে নামমাত্র করের বিনিময়ে পাচার করা টাকা দেশে ফেরত আনার সুযোগ দিলেও তাতে আশানুরূপ সাড়া পাওয়া যায়নি। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: গত বছরের ২৯ মার্চ, পর্যটন, শিল্প ও সংস্কৃতি মন্ত্রী আরেক বিবৃতিতে জানিয়েছিলেন, দেশটিতে গত ৩১ জানুয়ারি ২০২৪ পর্যন্ত ৫৬ হাজার ৬৬ জন এক্টিভ সেকেন্ড হোম পাস হোল্ডার রয়েছেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এর মধ্যে ২৪ হাজার ৭৬৫ জন পাসধারী নিয়ে শীর্ষে ছিলেন চীন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এরপরে যথাক্রমে দক্ষিণ কোরিয়ার ৪ হাজার ৯৪০ জন, জাপানের ৪ হাজার ৭৩৩ জন এবং বাংলাদেশের ছিল তিন হাজার ৬০৪ জন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: জরিপ বলছে- গত ৭ বছরে বাংলাদেশির সংখ্যা বেড়ে হয়েছে প্রায় ২৪ গুণ। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ওখানে একজন বাংলাদেশি ব্যক্তি গড়ে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা খরচ করলেই সেকেন্ড হোমের সুবিধা পান। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: প্রবাসী বাংলাদেশি বলেন, মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি অধ্যুষিত বেশ কয়েকটি এলাকা গড়ে উঠেছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: সেখানকার অধিবাসীরা ফ্ল্যাট কিনে থাকছেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: আর ফ্ল্যাটের দাম কোনো কোনো ক্ষেত্রে বাংলাদেশের চেয়েও কম।

