বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তোলার কথা বলে মায়ের আইফোনটি নিয়ে বাসা থেকে বের হয়েছিল ১৩ বছরের কিশোর ইশায়াত শাহরিয়ার ওরফে অপ্রতীম। কিন্তু ২৪ ঘণ্টা পার না হতেই পাহাড়ঘেরা নির্জন জঙ্গল থেকে উদ্ধার করা হলো তার রক্তাক্ত নিথর দেহ। একটি আইফোন ছিনতাইয়ের লোভেই এই নৃশংস হত্যাকাণ্ড কি না তা নিয়ে পুরো কুমিল্লাজুড়ে তীব্র ক্ষোভ ও শোকাচ্ছন্ন পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে।
আজ শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) দুপুরে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়-সংলগ্ন লালমাই পাহাড়ের সানন্দা এলাকার একটি গভীর জঙ্গল থেকে ইশায়াতের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। তার মাথায় ভারী বস্তু দিয়ে জঘন্য আঘাতের চিহ্ন রয়েছে বলে জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
ইশায়াত শাহরিয়ার কোটবাড়ি এলাকার বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। সে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগম এবং কে এম ফিরোজ শাহরিয়ারের একমাত্র সন্তান। তারা কুমিল্লা সদর দক্ষিণ থানার ২৪ নম্বর ওয়ার্ডের কোটবাড়ি এলাকায় মা-বাবার সঙ্গে থাকত।
‘১০টা ফোন মুক্তিপণ চাইতি—দিতাম’
একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে সম্পূর্ণ দিশাহারা হয়ে পড়েছে স্বজনেরা। ইশায়াতের মর্মান্তিক মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর পুরো কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় পরিবার, শিক্ষক-শিক্ষার্থী এবং স্থানীয় অধিবাসীদের মাঝে নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া।
মরদেহ উদ্ধারের পর ক্ষোভ প্রকাশ করে ফেসবুকে আবেগঘন এক বার্তা দেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মোহাম্মদ মাহমুদুল হাসান খান। তিনি লেখেন:
“শুধুমাত্র একটি আইফোনের জন্য ছেলেটাকে মেরে ফেললি। এ রকম ১০টা ফোন মুক্তিপণ হিসেবে চাইতি—আমরা দিতাম। নিখোঁজ অপ্রতীমকে মেরে ফেলা হয়েছে। হে আল্লাহ বাবা-মাকে ধৈর্য ধরার তৌফিক দান করুন।”
ঘটনায় শোক প্রকাশ করে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক আবদুল হাকিম বলেন, “বাংলা বিভাগের শিক্ষকের একমাত্র ছেলের এমন নির্মম মৃত্যু আমরা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছি না। পুরো বিশ্ববিদ্যালয় পরিবার এই নারকীয় ঘটনায় স্তম্ভিত।”
যেভাবে উদ্ধার হলো মরদেহ
পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গতকাল শুক্রবার বেলা আড়াইটার দিকে মায়ের আইফোন নিয়ে বাসা থেকে বের হওয়ার পর ইশায়াত আর ফেরেনি। সম্ভাব্য সব জায়গায় খোঁজাখুঁজি করে কোনো সন্ধান না পেয়ে স্বজনেরা সদর দক্ষিণ থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন।
-
প্রথম সোর্স: শনিবার সকালে লালমাই পাহাড়ের সানন্দা এলাকায় কাজ করতে গিয়ে স্থানীয় এক শ্রমিক জঙ্গলে এক শিশুর রক্তাক্ত দেহ পড়ে থাকতে দেখেন।
-
মরদেহ শনাক্তকরণ: খবর পেয়ে পুলিশ ও কুবির শিক্ষার্থীরা ঘটনাস্থলে গিয়ে লাশ উদ্ধার করে ইশায়াতের পরিবারকে খবর দেয়। পরে স্বজনেরা গিয়ে অপ্রতীমের নিথর দেহ শনাক্ত করেন।
-
ময়নাতদন্ত: লাশের মাথায় একাধিক আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ কুমিল্লা মেডিকেল কলেজের মর্গে পাঠানো হয়েছে।
তদন্তের গতিপ্রকৃতি ও পুলিশের বক্তব্য
কুমিল্লা সদর দক্ষিণ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ রকিবুল ইসলাম জানান, খবর পাওয়ার পর থেকেই পুলিশ বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে কাজ করছে।
কুমিল্লার পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান জানান, সিসিটিভি ফুটেজ এবং প্রযুক্তিগত তথ্যাদি বিশ্লেষণ করে অপরাধীদের শনাক্তে কাজ চলছে। ইতোমধ্যে কিছু গুরুত্বপূর্ণ সূত্র বা ‘ক্লু’ পাওয়া গেছে এবং কয়েকজনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। এটি কেবল ফোন ছিনতাই নাকি এর পেছনে অন্য কোনো শত্রুতা জড়িয়ে আছে, তা খুব দ্রুতই উন্মোচন করা হবে।

