বৃহস্পতিবার ক্যামেরুনের প্রেসিডেন্ট পল বিয়ার দেশের বাইরে থাকার দুই মাস পূর্ণ হলো। তাঁর এই দীর্ঘ অনুপস্থিতি মধ্য আফ্রিকার এই দেশটিতে তাঁর স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ এবং একটি রাজনৈতিক শূন্যতার আশঙ্কা তৈরি করেছে। গত ৭ জুন তিনি ইউরোপে একটি "সংক্ষিপ্ত ব্যক্তিগত সফরের" উদ্দেশ্যে দেশ ছাড়েন, যা এখন তাঁর অন্যতম দীর্ঘতম বিদেশ সফরে পরিণত হয়েছে।
বিশ্বের সবচেয়ে বয়স্ক এই রাষ্ট্রপ্রধান ১৯৮২ সাল থেকে ক্যামেরুন শাসন করছেন। গত নভেম্বর মাসে অনুষ্ঠিত একটি বিতর্কিত নির্বাচনে জয়ী হয়ে তিনি অষ্টম মেয়াদে ক্ষমতা গ্রহণ করেন। প্রেসিডেন্টের স্বাস্থ্য নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই নানা গুঞ্জন চলছে। তিনি প্রায়ই ইউরোপে, বিশেষ করে ফ্রান্স এবং সুইজারল্যান্ডে দীর্ঘ সময় কাটান। এ সময় তিনি তাঁর দলের শীর্ষ নেতা ও পরিবারের সদস্যদের ওপর দেশের শাসনভার ছেড়ে দেন।
ক্যামেরুনের সংবিধানে প্রেসিডেন্টের কয়েক মাস দেশের বাইরে থাকার ওপর সুনির্দিষ্ট কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই। তবে দেশে কোনো ভাইস প্রেসিডেন্ট না থাকায় বিরোধীরা অভিযোগ করছেন যে, দেশ এখন "অটো পাইলট" বা চালকহীনভাবে চলছে। উল্লেখ্য, ভাইস প্রেসিডেন্ট নিয়োগের বিষয়টি সম্পূর্ণভাবে পল বিয়ার নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
নির্বাসনে থাকা ক্যামেরুনের বিরোধী দলীয় নেতা ইসা চিরোমা বাকারী, যিনি গত নভেম্বরের নির্বাচনে রানার-আপ হয়েছিলেন এবং একসময় বিয়ার মিত্র ছিলেন, দ্য গাম্বিয়া থেকে এক বার্তায় বলেন, ক্যামেরুনের জনগণের মধ্যে এমন ধারণা তৈরি হয়েছে যে বিয়ার শারীরিক অবস্থা ভালো নয়। তিনি বলেন, "সুইজারল্যান্ডে বিয়ার এই দীর্ঘ অবস্থান তাঁর বৈধতার সংকটকে আরও বাড়িয়ে তুলছে এবং জোরপূর্বক ক্ষমতায় টিকে থাকার মরিয়া প্রচেষ্টাকে প্রকাশ করছে।"
দীর্ঘ প্রায় অর্ধশতাব্দীর শাসনামলে ক্যামেরুনের পরিস্থিতি বেশ মিশ্র। দেশটির উত্তরে বোকো হারাম এবং পশ্চিমে বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীর সশস্ত্র বিদ্রোহের পাশাপাশি স্থবির অর্থনীতি তরুণ সমাজকে হতাশ করে তুলেছে। ডিশাং বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকারি ও আন্তর্জাতিক আইনের অধ্যাপক উইলসন তামফু ক্যামেরুনকে একটি "গুরুতর অসুস্থ" মানবদেহের সঙ্গে তুলনা করেছেন। তিনি বলেন, "এই বয়সেও বিয়া নিজেকে শক্তিশালী প্রমাণ করার চেষ্টা করলেও, তাঁর স্বাস্থ্যগত সমস্যাগুলো যে তাঁর নেতৃত্বে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে তা স্পষ্ট। গত ১৫ বছরে মন্ত্রিসভায় যে রদবদল হয়েছে, তা মূলত একই লোকদের এক মন্ত্রণালয় থেকে অন্য মন্ত্রণালয়ে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দায়িত্ব দেওয়া ছাড়া আর কিছুই নয়।"
২০২৫ সালের পুনর্নির্বাচনে বিয়ার জয়লাভের পর দেশজুড়ে ব্যাপক বিক্ষোভ হয়েছিল, যাতে অন্তত চারজন নিহত হন। এটি মূলত দেশটির তরুণ জনগোষ্ঠীর সঙ্গে তাদের বয়োবৃদ্ধ নেতার মধ্যকার তীব্র উত্তেজনার বহিঃপ্রকাশ। ক্যামেরুনের প্রায় ৩ কোটি জনসংখ্যার ৭০ শতাংশেরই বয়স ৩৫ বছরের নিচে। অর্থাৎ, দেশের অধিকাংশ নাগরিকের জন্মেরও আগে থেকে ক্ষমতায় আছেন বিয়া। যদি তিনি তাঁর বর্তমান মেয়াদ পূর্ণ করেন, তবে তাঁর বয়স হবে প্রায় ১০০ বছর। ১৯৮২ সালে ক্যামেরুনের প্রথম প্রেসিডেন্ট আহমাদু আহিদজোর পদত্যাগের পর বিয়া ক্ষমতায় আসেন। পরবর্তীতে ২০০৮ সালে একটি সংবিধান সংশোধনীর মাধ্যমে প্রেসিডেন্টের মেয়াদকালের সীমা বাতিল করা হয়।
সম্প্রতি গত সোমবার পল বিয়া দেশের শীর্ষ সামরিক নেতৃত্বে বড় ধরনের রদবদল করেছেন। তিনি পাঁচটি যৌথ সামরিক অঞ্চলের চারটির কমান্ডারদের পরিবর্তন করেছেন এবং বেশ কয়েকজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকে উচ্চ পদে পদোন্নতি দিয়েছেন। যদিও এর কোনো আনুষ্ঠানিক কারণ জানানো হয়নি, তবে জানা গেছে যে প্রতিস্থাপিত কমান্ডারদের একজন মারা গেছেন এবং অন্যজন অবসরে গেছেন।

