মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ডেমোক্র্যাটিক পার্টির অভ্যন্তরীণ আদর্শিক লড়াই আরও তীব্র হয়ে উঠেছে। সম্প্রতি কানসাস, মিশিগান, মিসৌরি, ভার্জিনিয়া এবং ওয়াশিংটন অঙ্গরাজ্যে অনুষ্ঠিত প্রাইমারি নির্বাচনের ফলাফল এই দ্বন্দ্বের স্পষ্ট চিত্র তুলে ধরেছে। উচ্চ ভোটার উপস্থিতি এবং ব্যালটের প্রতিটি স্তরে তীব্র আদর্শিক লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে দলটির ভোটারদের মধ্যে একটি পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ডেমোক্র্যাট ভোটাররা ক্রমশ প্রগতিশীল হয়ে উঠছেন এবং দলীয় নেতৃত্বের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ জানাতে দ্বিধা করছেন না, যদিও এই পরিবর্তনের গতি অনেকের ধারণার চেয়ে ধীর ও অসম।
এই প্রাইমারি নির্বাচনে প্রগতিশীল ও সমাজতন্ত্রীরা বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ জয় পেয়েছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো সিনেট নির্বাচনে আব্দুল এল-সায়েদের জয়। এছাড়া কংগ্রেসের নির্বাচনী লড়াইয়ে ডোনাভান ম্যাককিনি ও উইল লরেন্স এবং ডেট্রয়েটের রাজ্য আইনসভার আসনে ক্রিস গিলমার-হিল বিজয়ী হয়েছেন। তবে বিভিন্ন জরিপ এবং গণমাধ্যমের খবরের ভিত্তিতে যে বড় ধরনের বিজয়ের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, ফলাফলের সামগ্রিক মাত্রা তার চেয়ে কিছুটা কম ছিল।
রাজনৈতিক তথ্য বিশ্লেষক এবং ২০২০ সালে বার্নি স্যান্ডার্সের নির্বাচনী প্রচারণায় যুক্ত থাকা ডেমোক্রেটিক সোশ্যালিস্টস অব আমেরিকার সক্রিয় সদস্য বেন ডেভিসের মতে, এই নির্বাচনী ফলাফল থেকে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পাওয়া যায়। প্রথমত, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে একটি শক্তিশালী বামপন্থী ভিত্তি গড়ে তোলার প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত ধীর ও কঠিন। এমন কোনো নির্দিষ্ট সময় বা বিন্দু নেই যেখানে পৌঁছালেই পুরো দল বা ভোটাররা হঠাৎ করে কট্টর বামপন্থীতে রূপান্তরিত হয়ে যাবে।
দ্বিতীয় শিক্ষাটি হলো, বামপন্থীরা এখন কেবল তরুণ ও কট্টর ডেমোক্র্যাট অধ্যুষিত নগর অঞ্চলেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং সুইং স্টেট বা দোদুল্যমান অঙ্গরাজ্যগুলোর রাজ্যব্যাপী প্রাইমারিতেও জয়লাভ করছে। আব্দুল এল-সায়েদের সংকীর্ণ ব্যবধানের জয়টিকে অনেকে হতাশাজনক মনে করলেও এটি আসলে একটি ঐতিহাসিক অর্জন। এর আগে বামপন্থীরা সুইং স্টেটের কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রাজ্যব্যাপী ডেমোক্র্যাটিক প্রাইমারিতে জয়ী হতে পারেনি। এই জয়টি বামপন্থীদের চেনা নগর ঘাঁটির বাইরেও একটি শক্তিশালী জোট গঠনের সক্ষমতা প্রমাণ করে।
গত এক দশক ধরে বামপন্থীদের কৌশল ছিল ধৈর্যশীল হওয়া। তারা প্রথমে সিটি কাউন্সিল এবং রাজ্য আইনসভায় জয় দিয়ে শুরু করে ধীরে ধীরে নিজেদের ভিত্তি তৈরি করেছে। পরবর্তীতে তারা মেয়র এবং কংগ্রেসের নির্বাচনে জয়ী হয়েছে। তবে এই সব জয়ই ছিল ডেমোক্র্যাটদের নিরাপদ বা গভীর নীল অঞ্চলগুলোতে। প্রাইমারি নির্বাচনে তারা মডারেট প্রার্থী, দলীয় প্রতিষ্ঠান এবং আইপ্যাক (AIPAC) ও ক্রিপ্টো লবির মতো বিপুল অর্থায়নকারী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে লড়াই করে নিজেদের প্রমাণ করেছে।
তবে বামপন্থীদের আসল পরীক্ষা হবে আগামী নভেম্বরের সাধারণ নির্বাচনে। উইসকনসিনে ফ্রান্সেসকা হং যদি এগিয়ে যান, তবে তাকে এবং এল-সায়েদকে প্রমাণ করতে হবে যে তারা কেবল প্রাইমারি নয়, বরং রিপাবলিকানদের পরাজিত করার মতো একটি বিস্তৃত জোট গঠন করতে পারেন। ডেমোক্র্যাটদের সিনেট ধরে রাখা এবং গভর্নর পদ অক্ষুণ্ণ রাখার জন্য এটি অত্যন্ত জরুরি। এছাড়া ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট প্রাইমারির ভোটারদের কাছেও এটি একটি বার্তা দেবে যে বামপন্থী প্রার্থীরা প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ সাধারণ নির্বাচনে জয়ী হতে সক্ষম।
মঙ্গলবারের প্রাইমারিতে বামপন্থীরা তরুণ ভোটারদের সক্রিয় করার পাশাপাশি আরব ও মুসলিম ভোটারদের পুনরায় ডেমোক্র্যাটিক শিবিরে ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে। তবে এই জয়গুলো আন্দোলনের মূল চ্যালেঞ্জকে পুরোপুরি সমাধান করে না। প্রতিটি প্রাইমারি এখনো একটি কঠিন লড়াই, যা প্রার্থী, সাংগঠনিক দক্ষতা, অর্থ ব্যয় এবং স্থানীয় পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে। ডেমোক্র্যাটিক পার্টির অভ্যন্তরে বামপন্থীদের অগ্রযাত্রা অব্যাহত থাকলেও, নভেম্বরের নির্বাচনে রিপাবলিকানদের হারাতে পারে এমন সাধারণ নির্বাচনী জোট গঠন করাই এখন তাদের প্রধান চ্যালেঞ্জ।

