প্রগতিশীল রাজনীতির ধরন নিয়ে বর্তমানে যে বিভক্তি দেখা যাচ্ছে, তা প্রায়শই ব্যক্তিগত নৈতিকতার পরীক্ষায় পরিণত হয়। এই প্রেক্ষাপটে ফ্রান্সের সেন্ট-ওয়েন-সুর-সেইন শহরে হালাল চিকেন চেইন ‘মাস্টার পুলে’-এর একটি শাখা খোলা নিয়ে সৃষ্ট বিতর্কটি নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। শহরটির মেয়র করিম বোয়ামরানে শাখাটি খোলার পরপরই দোকানের সামনে কংক্রিটের ব্লক বসিয়ে তা বন্ধ করার চেষ্টা করেছিলেন। আদালত সেই ব্লক সরানোর নির্দেশ দিলে তিনি সেখানে বড় বড় রঙিন ফুলের টব বসিয়ে দেন। দোকান কর্তৃপক্ষও এর পাল্টা হিসেবে দোকানের সামনে ব্যঙ্গাত্মক সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করে। যেমনটা মরিস ক্যাসানোভা, যিনি ‘মিস্টার চিকেন’ নামে পরিচিত, দাবি করতেন যে তিনি লন্ডনের ৯০% চিকেন শপের সাইন ডিজাইন করেছিলেন, এই দোকানের সাইনবোর্ডগুলোও তেমনি মনোযোগ কেড়েছে।
মেয়র বোয়ামরানে দাবি করেছিলেন, মূলত দেরিতে পণ্য সরবরাহ এবং রান্নার গন্ধের কারণে স্থানীয় বাসিন্দাদের জীবনযাত্রায় ব্যাঘাত ঘটছে বলেই তিনি এই পদক্ষেপ নিয়েছেন। তবে সমালোচকদের মতে, প্যারিস অলিম্পিককে কেন্দ্র করে শহরটিতে যে উন্নয়নের জোয়ার এসেছে, তার আড়ালে এটি মূলত এক ধরনের জেন্ট্রিফিকেশন বা উচ্চবিত্তায়নের প্রক্রিয়া। তারা অভিযোগ করছেন, মেয়র সস্তায় খাবার পাওয়া এবং নিম্নবিত্ত মানুষের উপস্থিতি কমিয়ে দিতে চাইছেন। ‘মাস্টার পুলে’-তে রোটিসেরি চিকেন ও আলুর একটি খাবারের দাম মাত্র ৪ ইউরো (৩.৪০ পাউন্ড), যা ম্যাকডোনাল্ডসের চেয়েও সস্তা।
এই বিতর্কে এখন বামপন্থি দল ‘লা ফ্রান্স ইনসুমিস’ (এলএফআই)-এর নেতারাও জড়িয়ে পড়েছেন। তারা মেয়রের এই পদক্ষেপকে ক্ষমতার অপব্যবহার এবং ইসলামোফোবিয়া ও শ্রেণিবিদ্বেষের বহিঃপ্রকাশ বলে অভিহিত করেছেন। এলএফআই-এর এমপি এরিক কোকেরেল সংহতি প্রকাশ করতে সরাসরি দোকানটি পরিদর্শন করেছেন। এদিকে, মেয়র বোয়ামরানে গত মাসে প্রেসিডেন্ট পদে লড়ার ঘোষণা দিয়েছেন এবং এলএফআই-কে ‘ঔপনিবেশিক দল’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। ফরাসি রাজনীতির এই জটিল সমীকরণ মনে করিয়ে দেয় ২০২৪ সালের কথা, যখন এলএফআই এবং পিএস জোটবদ্ধ হয়ে মেরিন ল্য পেনের কট্টর ডানপন্থি ন্যাশনাল র্যালিকে রুখতে চেয়েছিল। সেই সময় যুক্তরাজ্যেও নাইজেল ফারাজকে নিয়ে ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিটের সম্ভাবনা নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছিল।
চিকেন শপগুলো ঐতিহাসিকভাবে দক্ষিণ এশীয় অভিবাসীদের জীবিকার উৎস এবং ব্রিটিশ কৃষ্ণাঙ্গ সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে পরিচিত। লন্ডনের ‘চিকেন শপ ডেট’ বা ঋষি সুনাকের নান্দো’স ভোজনের আলোচনার মতো বিষয়গুলো চিকেন শপের সাংস্কৃতিক প্রভাবকেই তুলে ধরে। বর্তমানে ফ্রান্সের এই রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং মেরুকরণ এমন এক সময়ে ঘটছে, যখন কট্টর ডানপন্থি মেরিন ল্য পেন পরবর্তী প্রেসিডেন্ট হওয়ার দৌড়ে এগিয়ে আছেন। রাজনীতির এই জটিল খেলায় ‘রুলিং দ্য রোস্ট’ বা ক্ষমতার দাপট দেখানোর চেয়ে ‘বার্ডস অফ আ ফেদার’ বা ঐক্যের প্রয়োজনীয়তাই এখন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। এই নিবন্ধের বিষয়বস্তু নিয়ে আপনার কোনো মতামত থাকলে ৩০০ শব্দের মধ্যে ইমেইলের মাধ্যমে আমাদের চিঠিপত্র বিভাগে প্রকাশের জন্য পাঠাতে পারেন।

