অতীতে গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দেশে একধরনের ‘ভয়ের সংস্কৃতি’ চালু ছিল, যা অনেক ক্ষেত্রে ‘পুলিশি রাষ্ট্র’ হিসেবে সমালোচিত হতো। তবে বর্তমানে ছবিটা পুরোপুরি উল্টো। সম্প্রতি অপরাধীদের মধ্যে আইন কিংবা পুলিশকে ভয় না পাওয়ার বা ‘তোয়াক্কা না করার’ (ড্যাম কেয়ার) এক নতুন মানসিকতা পরিলক্ষিত হচ্ছে। ফলে প্রতিদিন শত শত অপরাধীকে গ্রেফতার করা হলেও সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনতে হিমশিম খাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
গত বুধবারও রাজধানীর মিরপুরে ফুটপাতে হকার উচ্ছেদের সময় পুলিশের ওপর সরাসরি হামলা চালায় দুর্বৃত্তরা। এতে এলাকাটি রণক্ষেত্রে পরিণত হয় এবং পুলিশের গাড়িসহ ঢাকা উত্তর সিটির একাধিক এক্সকেভেটর ও যানবাহনে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়।
সাম্প্রতিক চাঞ্চল্যকর অপরাধচিত্র
সাম্প্রতিক দিনগুলোতে দেশজুড়ে একের পর এক নৃশংস ও অপ্রীতিকর ঘটনা ‘টক অব দ্য কান্ট্রি’তে পরিণত হয়েছে, যা সরকারের জন্য চরম অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি করেছে:
-
প্রতিষ্ঠান ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে সশস্ত্র হামলা: রাজধানীর ‘রাড্ডা ম্যাটার্নাল অ্যান্ড চাইল্ড হেলথ সেন্টারে’ হামলা চালিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় ৯ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং এক সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে। এছাড়া ইসিবি চত্বরে নিউ গিনি প্রোপার্টিজে হামলা ও কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিও ভাঙচুরের ঘটনায় সাবেক এক সেনা কর্মকর্তাসহ ৭ জনকে গ্রেফতার করা হয়।
-
মব হামলা ও কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য: মোহাম্মদপুরে সশস্ত্র জমি দখল, আদাবরে আটতলা বাড়ি দখলের চেষ্টা এবং চট্টগ্রামে কিশোর গ্যাংয়ের ধারাবাহিক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ সাধারণ মানুষের মধ্যে গভীর আতঙ্ক তৈরি করেছে।
-
কুমিল্লায় স্কুলছাত্র হত্যা: ১৮ সেপ্টেম্বর নিখোঁজ হওয়া কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের সন্তান ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমের ক্ষতবিক্ষত লাশ লালমাই পাহাড়ের জঙ্গল থেকে উদ্ধারের ঘটনা নিরাপত্তা ব্যবস্থার নাজুক রূপটি সামনে এনেছে।
সরকার ও প্রশাসনের অবস্থান
পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের তরফ থেকে ব্যাপক পুলিশি তৎপরতা শুরু হয়েছে। কেবল বুধবারেই রাজধানী থেকে চার শতাধিক অপরাধীকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
-
তথ্য উপদেষ্টার বক্তব্য: প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান মঙ্গলবার জানান, সাম্প্রতিক ভাঙচুর ও হামলার ঘটনাগুলোতে সরকার চরম বিব্রত। তবে বিগত বৈষম্যমূলক সংকট থেকে পুলিশকে পুনর্গঠন করে কাজ শুরু করতে সময় লাগছে। অপরাধীদের দলীয় পরিচয় বিবেচনা না করে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন তিনি।
-
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য: বুধবার সচিবালয়ে আয়োজিত এক ব্রিফিংয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, “দু-একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা দিয়ে দেশের পুরো আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিচার করা ঠিক নয়। সরকার বা পুলিশের কোনো ব্যর্থতা নেই, কারণ ৯৯৯-এ ফোন পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই পুলিশ ব্যবস্থা নিচ্ছে।” চাঁদাবাজ, সন্ত্রাসী ও কিশোর গ্যাং দমনে যৌথ অভিযান আরও জোরদার করা হবে বলে তিনি জানান।
বিশেষজ্ঞ ও সাবেক পুলিশ কর্মকর্তাদের বিশ্লেষণ
অপরাধ বিশেষজ্ঞ ও সাবেক প্রশাসনিক কর্মকর্তারা পুলিশকে ভয় না পাওয়ার পেছনে কয়েকটি মৌলিক কারণ চিহ্নিত করেছেন:
১. প্রভাবশালীদের রাজনৈতিক আশ্রয়: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, “অতীতে অপরাধীদের মধ্যে আইনের প্রতি যে ভয় কাজ করত, বর্তমানে সেটি অনুপস্থিত। অপরাধীরা যখন দেখে যে তাদের পেছনে প্রভাবশালী চক্রের অদৃশ্য হাত রয়েছে, তখন তাদের মধ্যে ‘তোয়াক্কা না করার’ প্রবৃত্তি কাজ করে।”
২. দৃশ্যায়ন ও রাজনৈতিক পরিচয়হীন শাস্তি: সাবেক আইজিপি আব্দুল কাইয়ুম মনে করেন, শুধু গ্রেফতারই যথেষ্ট নয়; জনমনে স্বস্তি ফেরাতে দৃশ্যমান কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে। রাজনৈতিক পরিচয় ছাপিয়ে মূল মদদদাতাদের চিহ্নিত না করতে পারলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা কঠিন হবে।
৩. পুলিশের মনোবল ও প্রশাসনিক গতি: অভ্যুত্থান-পরবর্তী ভঙ্গুর অবস্থা থেকে পুলিশের মনোবল ও প্রশাসনিক সক্ষমতা বাড়িয়ে মাঠপর্যায়ে নিরপেক্ষ আইন প্রয়োগ নিশ্চিতে অগ্রাধিকার দেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন তারা।

