বাজারে ডলারের তীব্র সংকট রয়েছে এবং বিনিময় হার আরও বৃদ্ধি পেতে পারে এমন আলোচনার আবহেই উল্টো চিত্র দেখা গেল বাংলাদেশ ব্যাংকের ডলার বিক্রির নিলামে। বাজারে মার্কিন ডলারের প্রকৃত চাহিদা ও বিনিময় হার যাচাই করতে ব্যাংকগুলোর জন্য ২ কোটি (২০ মিলিয়ন) ডলার বিক্রির ঘোষণা দিয়েছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তবে নিলামে শেষ পর্যন্ত ৬টি ব্যাংক মিলে কিনেছে মাত্র ১ কোটি ১৫ লাখ ডলার। ফলে বিক্রির জন্য নির্ধারিত অবশিষ্ট ৮৫ লাখ ডলার অবিক্রিতই রয়ে গেছে।
আজ বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান নিশ্চিত করেছেন যে, আজ বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে নতুন করে কোনো ডলার বিক্রি করার প্রয়োজন পড়েনি। গত সোমবারের (১৪ সেপ্টেম্বর) অনুষ্ঠিত নিলামের ফলাফল বিশ্লেষণ করে মঙ্গলবার এই তথ্য আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়।
ডলার নিলামের সার্বিক চিত্র
দীর্ঘ ১৪ মাস বাজার থেকে ডলার কেনার পর প্রথমবারের মতো বিক্রির উদ্যোগে সব ব্যাংককে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানালেও কেবল ৬টি ব্যাংক ক্রয়ের প্রস্তাব জমা দেয়:
-
ডলার বিক্রির সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন দর: ১২২ টাকা ৮০ পয়সা থেকে ১২৩ টাকা ৩৫ পয়সা।
-
গড় বিক্রয় দর (Average Rate): ১২৩ টাকা ২২ পয়সা।
-
কাট-অফ রেট (Cut-off Rate): ১২২ টাকা ৮০ পয়সা।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, “বাজারে সত্যিই অতিরিক্ত ডলারের কৃত্রিম বা বাস্তব সংকট রয়েছে কি না, তা যাচাই করতেই এই নিলামের আয়োজন ছিল। ব্যাংকগুলোর জন্য পুরো ২ কোটি ডলারই উন্মুক্ত ছিল, তারা চাইলে অবিক্রিত ৮৫ লাখ ডলারও নিতে পারত। চাহিদাহীনতার এই চিত্রই প্রমাণ করে বাজারে ডলার ঘাটতির দাবি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।”
দীর্ঘ ১৪ মাস পর বিক্রি, রিজার্ভে স্বস্তি
২০২৫ সালের জুলাই থেকে বিশ্ববাজারে অস্থিরতা কমায় এবং অভ্যন্তরীণ সরবরাহ ভালো থাকায় গত ১৪ মাসে বাজার থেকে প্রায় ৬০০ কোটি ডলার কিনেছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। সর্বশেষ গত ১ সেপ্টেম্বরেও বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে ১২২ টাকা ৭৫ পয়সা কাট-অফ রেটে ৫ কোটি ডলার কিনে নেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) হিসাব পদ্ধতি বিপিএম৬ (BPM6) অনুযায়ী, গত ১০ সেপ্টেম্বর দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩১ দশমিক ৩৬ বিলিয়ন ডলারে। গত বছরের একই সময়ে যা ছিল ২৫ দশমিক ৬৮ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে রিজার্ভ বেড়েছে ৫ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার। রিজার্ভ শক্তিশালী থাকায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে চাপ দিয়ে ডলার বিক্রির প্রয়োজন পড়ছে না।
আমদানি ব্যয় বনাম বাজারের প্রকৃত তারল্য
চলতি অর্থবছরের জুলাইয়ে পেট্রোলিয়াম পণ্য আমদানি ৮৩.৩ শতাংশ বাড়ায় মোট আমদানি ব্যয় ৮.৬ শতাংশ বেড়ে ৬৪৪ কোটি ডলারে পৌঁছায়। বিপরীতে রফতানি আয় ১.৬ শতাংশ কমে ৪৩৫ কোটি ডলারে নামায় বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে কিছুটা প্রভাব ফেললেও তা সামগ্রিক তারল্যে ধস নামাতে পারেনি। গত ১৫ সেপ্টেম্বর আন্তঃব্যাংক বাজারে ডলারের গড় মূল্য ছিল ১২৩ টাকা ৩৫ পয়সা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্তারা বলছেন, ২ কোটি ডলার বিক্রি করতে গিয়েও গ্রাহক না পাওয়ার মাধ্যমে বাজারে এটিই স্পষ্ট বার্তা দেয় যে, ডলারের দাম বৃদ্ধি নিয়ে আলোচনা থাকলেও ব্যাংকিং ব্যবস্থায় বড় ধরনের তারল্য সংকট নেই।

