হযরত নূহ (আ.)-এর যুগের ঐতিহাসিক মহাপ্লাবন সমগ্র পৃথিবীজুড়ে হয়েছিল, নাকি তা নির্দিষ্ট কোনো অঞ্চলে সীমাবদ্ধ ছিল—তা নিয়ে তাফসিরবিদ, ধর্মীয় গবেষক ও ঐতিহাসিকদের মধ্যে দুটি ভিন্ন মতামত রয়েছে। পবিত্র কোরআনের বর্ণনায় মহাপ্লাবনে নূহ (আ.)-এর জাতির ধ্বংস হওয়া এবং তার সন্তানদের মাধ্যমে মানবজাতির পুনরায় বংশবৃদ্ধির বিষয়টি স্পষ্ট হলেও, প্লাবনের ভৌগোলিক পরিধি নিয়ে এই মতপার্থক্য তৈরি হয়েছে।
প্রথম মত: সমগ্র পৃথিবীজুড়ে হয়েছিল মহাপ্লাবন
প্রাচীন মুফাসসিরদের একটি বড় অংশের মতে, নূহ (আ.)-এর আমলের মহাপ্লাবন পুরো পৃথিবীকেই প্লাবিত করেছিল। ইবনে কাসির (রহ.) সহ অনেক খ্যাতনামা তাফসিরকারকের মতে, প্লাবনের পানি পৃথিবীর সমতল ভূমি থেকে শুরু করে উঁচু পর্বতচূড়া পর্যন্ত ঢেকে ফেলেছিল এবং নৌকা ও নৌকার আরোহী ব্যাতীত স্থলভাগের কোনো প্রাণীই বেঁচে ছিল না।
এই মতের সমর্থকরা কোরআনের একাধিক আয়াতের বাহ্যিক অর্থ, আহলে কিতাব বা বাইবেলের (ওল্ড টেস্টামেন্ট) বর্ণনা এবং উচ্চ পর্বতচূড়ায় সামুদ্রিক প্রাণীর জীবাশ্ম পাওয়ার বিষয়টিকে দলিল হিসেবে উপস্থাপন করেন। বাইবেলের আদিপুস্তকের বর্ণনা অনুযায়ী, টানা ৪০ দিনের বৃষ্টিতে সমুদ্র ও আকাশের পানি মিলে পৃথিবীর সর্বোচ্চ পাহাড়ের ১৫ হাত ওপর পর্যন্ত পানি উঠে গিয়েছিল। এছাড়া, বিখ্যাত মুফাসসির তাহির ইবনে আশুর (রহ.) সূরা সফফাতের ৭৭ নম্বর আয়াতের ব্যাকরণগত বিশ্লেষণ করে উল্লেখ করেন যে, নূহ (আ.)-এর বংশধরদের মাধ্যমেই পরবর্তী পৃথিবীর মানবজাতি অবশিষ্ট ছিল, যা বিশ্বব্যাপী প্লাবনের ইঙ্গিত দেয়।
দ্বিতীয় মত: প্লাবন ছিল আঞ্চলিক এবং নির্দিষ্ট জাতির ওপর
অন্যদিকে, আধুনিক যুগের একদল চিন্তাবিদ, মুফাসসির ও বিজ্ঞানমনস্ক গবেষকদের মতে, এই মহাপ্লাবন সমগ্র পৃথিবীতে নয়; বরং নূহ (আ.)-এর কওম বা নির্দিষ্ট অঞ্চলের ওপর সংঘটিত হয়েছিল।
এই মতের পক্ষে প্রধান যুক্তি হলো, পবিত্র কোরআনে বর্ণিত অন্যান্য জাতির শাস্তির সুন্নাতুল্লাহ বা নিয়ম। আল্লাহ তাআলা কোনো নবী না পাঠিয়ে বা সত্যের বাণী না পৌঁছানো জাতির ওপর শাস্তি নাজিল করেন না। ফলে নূহ (আ.)-এর দাওয়াত যে অঞ্চলে সীমাবদ্ধ ছিল, শাস্তিও সেখানেই এসেছে। এছাড়া মিসর অঞ্চল বোঝাতে কোরআনে যেমন ‘আরদ’ (পৃথিবী/ভূমি) শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে, তেমনই মহাপ্লাবনের ক্ষেত্রেও ‘আরদ’ শব্দটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ড অর্থে ব্যবহৃত হয়ে থাকতে পারে।
বিখ্যাত তাফসিরবিদ ইমাম মুহাম্মদ আবদুহ (রহ.) এবং তার ছাত্র রাশিদ রিদা (রহ.) উল্লেখ করেছেন, মহাপ্লাবন বিশ্বব্যাপী হয়েছিল—এমন কোনো অকাট্য ধর্মীয় দলিল নেই। আধুনিক ভূতাত্ত্বিক গবেষণাতেও বিশ্বব্যাপী একযোগে এভারেস্ট পর্বত ঢেকে ফেলার মতো পানিপ্লাবনের কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ মেলেনি, বরং নির্দিষ্ট অঞ্চলের বড় ধরনের ঐতিহাসিক বন্যার প্রমাণ রয়েছে। বাংলাদেশের প্রখ্যাত ইসলামী গবেষক ড. খোন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীরও (রহ.) তার গবেষণায় বাইবেলের বৈশ্বিক প্লাবনের ধারণার অমিল ও ভৌগোলিক অসংগতি তুলে ধরে আঞ্চলিক প্লাবনের যুক্তিকে শক্তিশালী বলেছেন।
সারসংক্ষেপ
সার্বিকভাবে, পবিত্র কোরআন ও হাদিসের আলোকে নূহ (আ.)-এর যুগে এক নজিরবিহীন মহাপ্লাবন সংঘটিত হওয়া এবং সত্য প্রত্যাখ্যানকারী কাফেরদের চূড়ান্ত বিনাশের বিষয়টি প্রমাণিত সত্য। তবে সেই প্লাবনের পরিধি সমগ্র ভূমণ্ডলজুড়ে ছিল নাকি নূহ (আ.)-এর জাতির অধিবসতি অঞ্চলেই সীমাবদ্ধ ছিল, তা অকাট্য দলিলের অভাবে আলেম ও বিশেষজ্ঞদের কাছে একটি সুনির্দিষ্ট আলোচনা ও মতপার্থক্যের বিষয় হিসেবে রয়ে গেছে।

