পবিত্র কাবা শরিফ বিশ্বের ২০০ কোটিরও বেশি মুসলিমের কাছে পরম পবিত্র ও ঐক্যের প্রতীক। মক্কার মসজিদুল হারামের কেন্দ্রে অবস্থিত এই পবিত্র ঘরকে ঘিরেই আবর্তিত হয় ইসলামের বহু ইতিহাস। পবিত্র স্থান ও হারাম শরীফ হিসেবে মক্কার সীমানার ভেতরে যুদ্ধ ও রক্তপাত ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ হলেও, কাবার হাজার বছরের ইতিহাসে এটি বারবার মানবসৃষ্ট আক্রমণ, অবরোধ, রক্তপাত এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের সম্মুখীন হয়েছে।
ইতিহাসের পাতায় কাবার ওপর নেমে আসা প্রধান আঘাত এবং এর পুনর্নির্মাণের বিবরণ নিচে তুলে ধরা হলো:
কাবার ইতিহাসের প্রধান ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক আঘাতসমূহ
-
৬০৫ খ্রিস্টাব্দের অগ্নিকাণ্ড ও হাজরে আসওয়াদ: আগুন লেগে কাবার কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর হাজরে আসওয়াদ স্থাপন নিয়ে কুরাইশদের মধ্যে চরম বিরোধ দেখা দেয়। পরবর্তীতে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) নিজ বুদ্ধিমত্তায় সেই বিরোধের নিষ্পত্তি ঘটান এবং স্বহস্তে পাথরটি কাবার কোণে স্থাপন করেন।
-
৬৮৩ ও ৬৯২ খ্রিস্টাব্দের মক্কা অবরোধ: উমাইয়া শাসক ইয়াজিদের বাহিনী এবং পরবর্তীতে হাজ্জাজ ইবনে ইউসুফের নির্দেশে উমাইয়া সেনারা মক্কা অবরোধ করে। এই সময়ে আগুনে কাবা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং সাহাবি আবদুল্লাহ ইবনে জুবাইর (রা.) শহীদ হন।
-
৯৩০ খ্রিস্টাব্দের কার্মাতি আক্রমণ: কাবার ইতিহাসের সবচেয়ে নিকৃষ্ট ও ভয়াল হামলা চালায় কার্মাতি নামক চরমপন্থী বিদ্রোহী গোষ্ঠী। তারা হজের সময় মক্কায় হামলা চালিয়ে হাজার হাজার হাজিকে হত্যা করে এবং লাশ জমজম কূপে ফেলে দেয়। বিদ্রোহীরা হাজরে আসওয়াদ উপড়ে নিয়ে যায়, যা প্রায় ২৩ বছর পর খণ্ডবিখণ্ড অবস্থায় উদ্ধার করে আবার কাবার কোণে রূপালি ফ্রেমে পুনঃস্থাপন করা হয়।
-
১৬২৯ খ্রিস্টাব্দের আকস্মিক বন্যা: ভয়াবহ বন্যায় কাবার মূল দেয়াল ধসে পড়লে উসমানি সুলতান চতুর্থ মুরাদের আমলে গ্রানাইট পাথর দিয়ে কাবা পুনর্নির্মাণ করা হয়। বর্তমান কাবার মূল বাহ্যিক অবয়ব সেই নির্মাণেরই ধারাবাহিকতা।
১৯৭৯ সালের হারাম শরিফ দখলের আধুনিক ট্র্যাজেডি
আধুনিক ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সংকট তৈরি হয় ১৯৭৯ সালের ২০ নভেম্বর। জুহাইমান আল-ওতাইবি এবং তার অনুসারী সশস্ত্র চরমপন্থীরা ভোরের নামাজের সময় অতর্কিত হামলা চালিয়ে পবিত্র মসজিদুল হারাম দখল করে নেয়। তারা মিনারে স্নাইপার বসিয়ে প্রহরীদের হত্যা করে গেট বন্ধ করে দেয়।
পরবর্তীতে সৌদি সামরিক বাহিনী, ন্যাশনাল গার্ড এবং পাকিস্তানের বিশেষ বাহিনীর টানা দুই সপ্তাহের যৌথ অভিযানে প্রায় ২৫৫ জন নিহত ও ৫৬০ জন আহত হওয়ার মধ্য দিয়ে হারাম শরিফ মুক্ত হয়।
শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে টিকে থাকার প্রতীক
রাজনৈতিক সংঘাত, চরমপন্থা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ বহুবার এই পবিত্র স্থানের পবিত্রতা বিনষ্ট করার চেষ্টা করলেও তা কখনোই কাবার মর্যাদা হ্রাস করতে পারেনি। শত আঘাত অতিক্রম করে কাবা শরিফ আজও কোটি কোটি মুসলিমের ইবাদত, ভক্তি ও তাওহীদের অবিনাশী কেন্দ্র হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে।

