গ্যাস ও বিদ্যুতের তীব্র সংকটে চরম বিপর্যয় দেখা দিয়েছে দেশের তৈরি পোশাক খাতে। নিটিং, ডাইং ও গার্মেন্টস কারখানাগুলোতে উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। কোথাও উৎপাদন স্বাভাবিকের চেয়ে এক-তৃতীয়াংশ আবার কোথাও অর্ধেকের নিচে নেমে এসেছে।
জ্বালানি ঘাটতি সামাল দিতে গিয়ে অস্বাভাবিক হারে বাড়ছে বিকল্প প্রসেসিং খরচ এবং অপচয় হচ্ছে বিপুল শ্রমঘণ্টা। ফলে নির্দিষ্ট সময়ে রফতানি পণ্য শিপমেন্ট করতে না পারায় আন্তর্জাতিক বাজারের ক্রেতাদের আস্থা হারানোর বড় ঝুঁকিতে পড়েছেন দেশের তৈরি পোশাক খাত সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তারা।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) অন্তর্ভুক্ত প্রায় ২০ শতাংশ সদস্য কারখানার ওপর পরিচালিত এক জরুরি জরিপ শেষে এই উদ্বেগজনক চিত্র সামনে এসেছে। আক্রান্ত কারখানাগুলোর বড় অংশই নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, চট্টগ্রাম ও ঢাকার শিল্পাঞ্চলে অবস্থিত।
জরিপের মূলচিত্র: উৎপাদন ও জোগানের ঘাটতি
জরিপের বিশ্লেষণে উঠে আসে যে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক চাহিদার তুলনায় আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ায় শিল্পের প্রতিটি ধাপ স্থবির হয়ে পড়ছে।
-
গ্যাস ও বিদ্যুতের অপ্রাপ্তি: ৯০ শতাংশ কারখানা বিদ্যুৎ সংকটে এবং প্রায় ৭৫ শতাংশ কারখানা গ্যাসের তীব্র স্বল্পতার কারণে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার কথা জানিয়েছে।
-
গ্যাসের চাপ হ্রাস: কারখানাগুলোর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, স্বাভাবিক চাহিদার তুলনায় গ্যাসের বর্তমান সরবরাহে গড়ে প্রায় ৭৮ শতাংশ ঘাটতি রয়েছে।
-
বিদ্যুৎ বিভ্রাট: লোডশেডিংয়ের সময়সীমা পূর্বের তুলনায় গড়ে ২০০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, অর্থাৎ বিদ্যুৎ না থাকার সময়সীমা প্রায় তিন গুণ বেড়েছে।
উৎপাদনে ধস
জ্বালানির দ্বিমুখী সংকটের প্রভাবে তৈরি পোশাকের প্রতিটি সাব-সেক্টরে বড় ধস নেমেছে:
| খাত/প্রসেস | উৎপাদন হ্রাসের হার (গড়ে) |
| ডাইং খাত | ৫১% কমেছে (উৎপাদন প্রায় অর্ধেকে নেমেছে) |
| গার্মেন্টস সেলাই | ৪০% কমেছে |
| নিটিং খাত | ৩৮% কমেছে |
ব্যবসায়িক ঝুঁকি ও আর্থিক ক্ষতি
উদ্যোক্তারা জানাচ্ছেন, বিকল্প জ্বালানি দিয়ে কারখানা চালু রাখতে গিয়ে ৯২ শতাংশ প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন খরচ ব্যাপক বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের অভাবে শ্রমিক অলস বসে থাকায় ৯২ শতাংশ কারখানায় শ্রমঘণ্টার ব্যাপক অপচয় ঘটছে।
এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবে ৮৭ শতাংশ প্রতিষ্ঠানের সময়মতো শিপমেন্ট বিলম্বিত হচ্ছে এবং ৮৯ শতাংশ প্রতিষ্ঠান বিদেশি ক্রেতাদের আস্থা হারানোর শঙ্কায় পড়েছে। অর্ডার ধরে রাখতে এবং শিপমেন্ট জটিলতা এড়াতে প্রায় ৬০ শতাংশ প্রতিষ্ঠান ক্রেতাদের মূল্যছাড় (Discount) দিতে বাধ্য হচ্ছে। অন্যদিকে ৫৫ শতাংশ প্রতিষ্ঠানের রফতানি আদেশ বাতিল বা হ্রাস পেয়েছে। রফতানি আয় কমে যাওয়ায় ৫৮ থেকে ৫৯ শতাংশ কারখানা ব্যাংক ঋণ খেলাপির মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছে।
বিকেএমইএ নেতাদের বক্তব্য
পরিস্থিতি নিয়ে বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, “গ্যাস ও বিদ্যুতের তীব্র ঘাটতির কারণে নিটিং, ডাইং ও পোশাক খাত বড় ধরণের ধাক্কা খাচ্ছে। এখন পর্যন্ত গ্যাস সরবরাহের সুনির্দিষ্ট কোনো উন্নতি হয়নি।” তবে আশাবাদ ব্যক্ত করে তিনি বলেন, “প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শিল্প খাতে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গ্যাস সরবরাহের নির্দেশ দিয়েছেন। আশা করছি মঙ্গলবার রাতের পর থেকে গ্যাস সরবরাহ বাড়লে আগামীকাল থেকে পরিস্থিতি কিছুটা সহজ হতে পারে।”
বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামিম এহসান জানান, “জ্বালানি সংকটের কারণে সাময়িকভাবে উৎপাদন ব্যাহত ও খরচ বাড়লেও এখন পর্যন্ত কোনো কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়নি। সরকারের নীতিগত ও নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সহায়তা পেলে আমরা দ্রুত এই সংকট কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হব।”

