বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধির গতি কমে যাওয়ার সরাসরি প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায়। স্থবির কর্মসংস্থান, হ্রাস পাওয়া বিনিয়াগ এবং ধারাবাহিক উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের প্রকৃত আয় ও ক্রয়ক্ষমতা আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে। এর সাথে যুক্ত হয়েছে শিল্প খাতের জ্বালানি সংকট ও ব্যাংকিং খাতের অস্থিরতা। সব মিলিয়ে দেশে নতুন করে দারিদ্র্যের বিস্তার ঘটছে।
মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) বিশ্বব্যাংক প্রকাশিত ‘বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট’ প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয় যে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আগের বছরের তুলনায় প্রায় ২১ লাখ মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছেন। বিশ্বব্যাংকের মতে, আগামী ২০২৬ ও ২০২৭ অর্থবছরেও জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৪ শতাংশে সীমিত থাকতে পারে, যা দ্রুত অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনাকে ক্ষीण করে দিচ্ছে।
কারা হচ্ছেন নতুন দরিদ্র?
বিশ্বব্যাংকের মডেলভিত্তিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক দারিদ্র্যসীমা (দৈনিক ৩ ডলার) অনুযায়ী দেশে দারিদ্র্যের হার বেড়ে ১০.১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। অপরদিকে জাতীয় দারিদ্র্যসীমা অনুযায়ী ২০২২ সালের ১৮.৭ শতাংশ থেকে দারিদ্র্যের আনুমানিক হার বেড়ে ২২.৫ শতাংশে উন্নীত হয়েছে।
-
ঝুঁকিপূর্ণ নিম্নমধ্যবিত্ত: আগে যারা দারিদ্র্যসীমার ঠিক ওপরে ছিলেন, আয় হ্রাস ও লাগামহীন সংসার খরচের চাপে তারা পুনরায় দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছেন।
-
কাজ হারানো নারী ও শ্রমজীবী: শিল্প ও সেবা খাতে কর্মসংস্থান সংকুচিত হওয়ায় অনেক কর্মী বিশেষ করে নারীরা শ্রমবাজার থেকে ছিটকে পড়েছেন।
মূল্যস্ফীতি, মজুরি ও আয়-ব্যয়ের বৈষম্য:
অর্থনীতিবিদদের মতে, মূল্যস্ফীতির হার কিছুটা কমলেও (গত অর্থবছরে গড় ৮.৭%) নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও পরিবহনের খরচ আগের অবস্থানেই চড়া। বিপরীতে নিম্নআয়ের মানুষের মজুরি সে অনুপাতে না বাড়ায় প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমে গেছে, যা পরিবারগুলোকে মূলধনি সঞ্চয় ভেঙে জীবনযাপন করতে বাধ্য করছে।
বিনিয়োগ মন্দা, জ্বালানি সংকট ও ব্যাংকিং খাতের টানাপোড়েন:
কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগ পরিস্থিতির অবনতি দারিদ্র্য বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে:
-
বিনিয়োগ ও ঋণ প্রবৃদ্ধি: ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বেসরকারি বিনিয়োগ ০.৫% এবং সরকারি বিনিয়োগ ০.৭% কমেছে। জুন ২০২৬ নাগাদ ব্যাংক খাতে বেসরকারি ঋণের প্রবৃদ্ধি মাত্র ৪.৫ শতাংশে নেমে এসেছে, যা ৩৩ বছরের মধ্যে সর্বনিম্নে।
-
খেলাপি ঋণ: ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের হার বেড়ে ৩৩.২ শতাংশে পৌঁছেছে, ফলে উৎপাদনশীল খাতে ঋণপ্রবাহ ব্যাহত হচ্ছে।
-
জ্বালানি সংকট ও শিল্প: গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকটে শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি কমে প্রায় ২ শতাংশে নেমেছে। শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় নতুন কাজের সুযোগ তৈরির পথ প্রায় রুদ্ধ।
সামাজিক সুরক্ষা ও বিশেষজ্ঞদের মতামত:
সামাজিক সুরক্ষা বলয়ে সরকারের অর্থ বরাদ্দ থাকা সত্ত্বেও উপকারভোগী নির্বাচনে সমন্বয়হীনতার কারণে সবচেয়ে দরিদ্র পরিবারের প্রায় ৫০ শতাংশই সরকারি সহায়তার বাইরে থেকে যাচ্ছে।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুন জানান, নতুন করে ২১ লাখ মানুষের দরিদ্র হওয়া দেশের অর্থনীতির জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা। তিনি কেবল সামাজিক সহায়তার ওপর নির্ভর না করে শ্রমঘন শিল্পে বিনিয়োগ, এসএমই খাতে ঋণপ্রবাহ সহজীকরণ, পণ্যের অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি প্রতিরোধ এবং তরুণ ও নারীদের কর্মমুখী দক্ষতা বাড়ানোর মাধ্যমে টেকসই আয় নিশ্চিত করার তাগিদ দেন।

