দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে পর্তুগালের ফুটবলের সবচেয়ে বড় মুখ হয়ে ছিলেন ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। অসংখ্য রেকর্ড, শিরোপা, উচ্ছ্বাস আর আবেগের এক দীর্ঘ অধ্যায়ের পর এবার জাতীয় দলের জার্সিকে বিদায় জানালেন এই মহাতারকা। বৃহস্পতিবার সামাজিক মাধ্যমে আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের ঘোষণা দেন ৪১ বছর বয়সি এই ফরোয়ার্ড।
একটা সময় পর্তুগাল মানেই যেন ছিলেন ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। মাঠে তার উপস্থিতি, গোলের পর চেনা উদযাপন কিংবা শেষ মুহূর্তে ম্যাচের ভাগ্য বদলে দেওয়ার অসাধারণ ক্ষমতা—সবকিছুই হয়ে উঠেছিল পর্তুগিজ ফুটবলের অবিচ্ছেদ্য অংশ। সেই অধ্যায়েরই এবার সমাপ্তি ঘটল।
২০০৩ সালে জাতীয় দলের জার্সিতে যাত্রা শুরু। এরপর কেটে গেছে দীর্ঘ ২৩ বছর। এই সময়ে পর্তুগালের হয়ে ২৩৪ ম্যাচে ১৪৬ গোল, সঙ্গে ৪৫টি অ্যাসিস্ট। আন্তর্জাতিক ফুটবলে সর্বোচ্চ ম্যাচ ও গোলের রেকর্ড নিয়েই বিদায় নিলেন পাঁচবারের বর্ষসেরা ফুটবলার।
রোনালদোর আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের সবচেয়ে উজ্জ্বল মুহূর্ত ২০১৬ সালের ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ। তার নেতৃত্বেই প্রথমবার ইউরোপসেরা হওয়ার স্বাদ পায় পর্তুগাল। পরবর্তী সময়ে দুটি উয়েফা নেশন্স লিগ শিরোপাও যোগ হয় সাফল্যের মুকুটে।
তবে এত অর্জনের পরও একটি স্বপ্ন অপূর্ণই থেকে গেল। বিশ্বকাপের সোনালি ট্রফি কখনো হাতে তুলতে পারেননি সিআর সেভেন। ছয়টি বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া এবং প্রতিটি আসরে গোল করার অনন্য কীর্তি গড়লেও বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার স্বপ্ন আর পূরণ হলো না তার।
অবশ্য বিদায়ের গল্পটা কেবল রেকর্ড আর অর্জনের নয়। শেষ অধ্যায়ে ছিল বিতর্ক, অভিমান আর কোচের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন।
বিশ্বকাপের শেষ ষোলো থেকে পর্তুগালের বিদায়ের পরই আন্তর্জাতিক ফুটবল ছাড়ার কথা ভেবেছিলেন রোনালদো। তবে ফেডারেশনের অনুরোধ ও নতুন কোচ জর্জে জেজুসের পরিকল্পনায় আরও কিছুদিন জাতীয় দলে থাকার সিদ্ধান্ত নেন তিনি।
কিন্তু সেই ফেরাটা সুখকর হয়নি। উয়েফা নেশন্স লিগে ওয়েলসের বিপক্ষে ম্যাচে একাধিক সুযোগ নষ্ট করার পর নরওয়ের বিপক্ষে শুরুর একাদশে জায়গা হারান রোনালদো। কোচের সঙ্গে তৈরি হয় দূরত্ব। এরপর ডেনমার্ক ম্যাচের আগে জাতীয় দলের ক্যাম্প ছেড়ে যাওয়ায় বিতর্ক আরও বড় হয়।
কোচের বিরুদ্ধে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের অভিযোগ আনেন রোনালদো। ক্যাম্প ছাড়ার ঘটনায় পর্তুগিজ ফুটবল ফেডারেশন তাকে এক মাসের নিষেধাজ্ঞা দেয়। শাস্তি শেষে জাতীয় দলে ফেরার ইচ্ছা প্রকাশ করলেও শেষ পর্যন্ত সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে দাঁড়ান তিনি।
ফলে ওয়েলসের বিপক্ষে ম্যাচটিই হয়ে থাকল পর্তুগালের জার্সিতে রোনালদোর শেষ উপস্থিতি।
তবে আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানালেও এখনই বুটজোড়া তুলে রাখছেন না এই কিংবদন্তি। সৌদি আরবের ক্লাব আল নাস্রর হয়ে এখনও গোলের ক্ষুধা অটুট তার। সবশেষ আল খোলুদের বিপক্ষে হ্যাটট্রিক করে ক্যারিয়ারের গোলসংখ্যা নিয়ে গেছেন ৯৮৫-তে। সামনে এখনও হাতছানি দিচ্ছে এক হাজার গোলের ঐতিহাসিক মাইলফলক।
পর্তুগালের জার্সিতে আর দেখা যাবে না চেনা সেই সাত নম্বরকে। থাকবে না জাতীয় সংগীতের সময় তার দৃপ্ত উপস্থিতি কিংবা গোলের পর গ্যালারি কাঁপানো সেই বিখ্যাত উদযাপন।
তবু রোনালদোর গল্প শেষ হওয়ার নয়। পর্তুগিজ ফুটবলের ইতিহাসে তিনি থেকে যাবেন এক অনন্য অধ্যায় হয়ে।
বিদায় রোনালদো। জাতীয় দলের জার্সিতে শেষ হলো এক যুগের নয়, এক প্রজন্মের ফুটবল-রূপকথা।

