নারীর ‘ডাইনি’ অপবাদের নেপথ্যে ছিল অর্থনৈতিক স্বাধীনতা

কানেকটিকাটের ওয়েদার্সফিল্ডের বাসিন্দা ক্যাথরিন হ্যারিসন যখন তার স্বামীকে হারান, তখন তিনি ওই অঞ্চলের সবচেয়ে ধনী নারীতে পরিণত হন। তরুণী বিধবা হিসেবে ভেঙে না পড়ে তিনি উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া খামারটি নিজেই পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেন। পশুপালন, বিয়ার তৈরি, সুতা কাটা এবং মৌমাছি পালনের মতো কাজে যুক্ত হন তিনি। মধু ও মোমের বিনিময়ে মোমবাতি সংগ্রহ করতেন। সমসাময়িকদের কাছে তিনি ছিলেন অত্যন্ত স্পষ্টভাষী, জেদি ও বুদ্ধিমতী এক নারী।

বর্তমান যুগে হ্যারিসনের এই শখগুলো—যেমন ক্রাফট বিয়ার তৈরি, শহরে মৌমাছি পালন বা সুতা কাটার মতো কাজগুলো অনেকের কাছেই বেশ জনপ্রিয়। কিন্তু ১৭শ শতকের নিউ ইংল্যান্ডে একজন স্বাধীনচেতা, তিন কন্যাসন্তানের একক মা, যিনি পুরুষের ওপর নির্ভরশীল ছিলেন না এবং জ্যোতিষচর্চা করতেন, তার এই জীবনযাপনকে সমাজ ভালো চোখে দেখেনি। পুরুষতান্ত্রিক ও রক্ষণশীল সমাজে তার এই স্বাবলম্বিতা তাকে ডাইনি বা ‘উইচ’ অপবাদের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়। ১৬৬৮ সালে, উত্তরে প্রায় ২০০ কিমি দূরে সালেম ডাইনি ট্রায়াল শুরু হওয়ার দুই দশকেরও বেশি সময় আগে হ্যারিসনকে ডাইনি সন্দেহে গ্রেপ্তার করে বিচারের মুখোমুখি করা হয়।

লেখক লুসিয়ান টন্টি তার ‘গুড উইচ’ বইয়ের গবেষণার জন্য ২০২৪ সালে হ্যারিসনের সেই জমিতে যান। দীর্ঘ তিন বছর ধরে কানেকটিকাট থেকে ম্যাসাচুসেটস এবং সেখান থেকে স্কটল্যান্ড, ইংল্যান্ড, ডেনমার্ক ও নরওয়ে ভ্রমণ করে তিনি ১৫শ থেকে ১৮শ শতকের ইউরোপীয় ডাইনি শিকারের ইতিহাস অনুসন্ধান করেছেন। এই দীর্ঘ সময়ে প্রায় ৮০,০০০ থেকে ১,০০,০০০ মানুষের বিচার করা হয়েছিল, যার মধ্যে ৮০ শতাংশই ছিল নারী।

গবেষণায় দেখা যায়, ডাইনি শিকারের পেছনে ধর্মীয় ও রাজনৈতিক উত্তেজনা বা অর্থনৈতিক মন্দা কাজ করলেও, নারীর অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা ও ক্ষমতাই তাকে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে ফেলেছিল। হ্যারিসনের বিরুদ্ধে আনা প্রথম দফায় অভিযোগ খারিজ হলেও পরের বছর তাকে আবার আদালতে তলব করা হয়। তার বিরুদ্ধে শয়তানের সহায়তায় অলৌকিক কাজ করা, ভেষজ চিকিৎসা এবং প্রতিবেশীদের কাজে ক্ষতি করার অভিযোগ আনা হয়। পুরুষ তাঁতিরা অভিযোগ করেন যে হ্যারিসন তাদের ব্যবসায় বাধা দিতে জাদু করেছেন, আর এক দর্জি দাবি করেন হ্যারিসনের জাদুর কারণে তিনি একটি জ্যাকেটের হাতা টানা সাতবার ভুল সেলাই করেছেন। দুর্বল প্রমাণের কারণে শেষ পর্যন্ত হ্যারিসনের প্রাণ রক্ষা পেলেও তাকে ওয়েদার্সফিল্ড থেকে নির্বাসিত করা হয়।

মার্কিন ইতিহাসবিদ ক্যারল এফ কার্লসেন তার ১৯৮৭ সালের বই ‘দ্য ডেভিল ইন দ্য শেপ অব আ ওম্যান’-এ দেখিয়েছেন, যেসব পরিবারে কোনো পুরুষ উত্তরাধিকারী ছিল না (যেমন হ্যারিসনের ছিল তিন মেয়ে), সেইসব পরিবারের নারীরাই সম্পত্তি পাওয়ার পর সবচেয়ে বেশি ডাইনি অপবাদের শিকার হতেন। এই ধরনের নারীরা অভিযুক্তদের মধ্যে ৬৪ শতাংশ, দোষী সাব্যস্তদের মধ্যে ৭৬ শতাংশ এবং মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের মধ্যে ৮৯ শতাংশ ছিলেন। পুরুষতান্ত্রিক উত্তরাধিকার প্রথাকে টিকিয়ে রাখতেই মূলত এই অপবাদকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হতো।

ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. ফিলিপা কার্টারের এক গবেষণায় দেখা গেছে, ১৬শ ও ১৭শ শতকে দুগ্ধ উৎপাদন, স্বাস্থ্যসেবা ও পশুপালনের মতো যেসব পেশায় নারীরা জড়িত ছিলেন, সেখানে ডাইনি অপবাদের ঝুঁকি বেশি ছিল। রিচার্ড নেপিয়ার নামের এক চিকিৎসক ও জ্যোতিষীর কেসবুক থেকে জানা যায়, যিনি ১৫৯৭ থেকে ১৬৩৪ সালের মধ্যে অন্তত ১,৭১৪টি সন্দেহভাজন জাদুটোনার ঘটনা নথিভুক্ত করেছিলেন, দুধ নষ্ট হওয়া বা ক্ষত পচে যাওয়ার মতো স্বাভাবিক ঘটনাকেও তখন জাদুর কুপ্রভাব বলে গণ্য করা হতো। এছাড়া ১৩২৫ সালে পোপ জন ২২তম প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছাড়া নারীদের চিকিৎসাসেবা প্রদানকে ডাইনি বিদ্যা আখ্যা দিয়ে তা নিষিদ্ধ করার নির্দেশ দেন।

এই ধারাবাহিকতায় ১৫৯০ সালে স্কটল্যান্ডের বিধবা ও ভেষজ চিকিৎসক অ্যাগনেস স্যাম্পসনকে রাজা ষষ্ঠ জেমস ডাইনি অপবাদে বিচারের মুখোমুখি করেন। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, তিনি ঝড়ের সৃষ্টি করে রাজার জাহাজ ডুবিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। তীব্র নির্যাতনের মুখে স্যাম্পসন স্বীকারোক্তি দিতে বাধ্য হন। যদিও আধুনিক যুগে জ্যোতিষশাস্ত্র বা ট্যারো কার্ডকে নারী শক্তির প্রতীক হিসেবে দেখা হয়, কিন্তু ইতিহাস বলে এই ‘ডাইনি’ তকমাটি সবসময় নারীর ক্ষমতা কেড়ে নেওয়ার অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। এমনকি সম্প্রতি মেলবোর্নে ভিক্টোরিয়ার প্রিমিয়ার জেসিন্টা অ্যালানকে কালো টুপি পরিয়ে ডাইনি রূপে চিত্রিত করার ঘটনা প্রমাণ করে যে, আজও নারীর ক্ষমতাকে খর্ব করতে এই প্রাচীন অপবাদের ছায়া রয়ে গেছে।

শিরোনাম :
বাংলাদেশে বিনিয়োগে আগ্রহী মালয়েশিয়ার উদ্যোক্তারা! নিউইয়র্কে মানবিক সহায়তা সংস্থাগুলোর সাথে বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘের কাছে পরিত্যক্ত স্যুটকেস ঘিরে বোমা আতঙ্ক! জাতিসংঘকে ‘অকার্যকর’ বললেন আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট! রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন-দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যে গুরুত্বারোপ প্রধানমন্ত্রীর আইফোন ব্যবহারকারীদের ৩ হাজার কোটি টাকা দিচ্ছে অ্যাপল! ইউপি নির্বাচন হবে নির্দলীয় প্রতীকে: ইসি ফুডপান্ডার এমডিসহ ৫ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ২০২৬ চলছে, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রে শুরু হয়ে গেছে ২০২৮-এর প্রেসিডেন্ট দৌড় জাপানে মীর দোদি ও মোরি নানাকোর বিবাহোত্তর সংবর্ধনা সম্পন্ন বাংলাদেশে বিনিয়োগে আগ্রহী মালয়েশিয়ার উদ্যোক্তারা! নিউইয়র্কে মানবিক সহায়তা সংস্থাগুলোর সাথে বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘের কাছে পরিত্যক্ত স্যুটকেস ঘিরে বোমা আতঙ্ক! জাতিসংঘকে ‘অকার্যকর’ বললেন আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট! রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন-দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যে গুরুত্বারোপ প্রধানমন্ত্রীর আইফোন ব্যবহারকারীদের ৩ হাজার কোটি টাকা দিচ্ছে অ্যাপল! ইউপি নির্বাচন হবে নির্দলীয় প্রতীকে: ইসি ফুডপান্ডার এমডিসহ ৫ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ২০২৬ চলছে, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রে শুরু হয়ে গেছে ২০২৮-এর প্রেসিডেন্ট দৌড় জাপানে মীর দোদি ও মোরি নানাকোর বিবাহোত্তর সংবর্ধনা সম্পন্ন
DGEN NEWS
Privacy Overview

This website uses cookies so that we can provide you with the best user experience possible. Cookie information is stored in your browser and performs functions such as recognising you when you return to our website and helping our team to understand which sections of the website you find most interesting and useful.