বৈধ কাগজপত্র ও ট্রাভেল ডকুমেন্ট থাকা সত্ত্বেও নেপালগামী তিন প্রাপ্তবয়স্ক নারীকে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিদেশযাত্রায় বাধা দেওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে ইমিগ্রেশনে যাত্রীদের হয়রানির বিষয়টি নতুন করে সামনে এসেছে। আদালতের নির্দেশের পর ভুক্তভোগী ও অন্য নারী যাত্রীরা বিমানবন্দরে তাঁদের তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা প্রকাশ্যে আনছেন।
গত ৮ আগস্ট নেপালগামী রিফা তামান্না, সোহানি ইসলাম সমাপ্তি ও নাজনীন নামের তিন নারীকে ইমিগ্রেশনে বৈবাহিক অবস্থা, পরিবারের সম্মতি এবং অভিভাবক ছাড়া একা ভ্রমণের বিষয়ে নানা প্রশ্ন তুলে নেপাল যেতে বাধা দেওয়া হয়। কোনো আইনি নিষেধাজ্ঞা না থাকা সত্ত্বেও তাঁদের যাত্রা আটকে দেওয়ায় পরবর্তীতে বিচার চেয়ে আদালতের দ্বারস্থ হন তাঁরা।
হাইকোর্টের রুল ও সাত দিনের তদন্ত নির্দেশ:
গত ২৯ সেপ্টেম্বর বিচারপতি কে এম কামরুল কাদের ও বিচারপতি ফাতেমা আনোয়ারের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ বিষয়ে স্বতঃপ্রণোদিত রুল জারি করেন।
-
হাইকোর্টের নির্দেশনা: বৈধ কাগজপত্র থাকা সত্ত্বেও ওই তিন নারীকে বিদেশে যেতে বাধা দেওয়া কেন আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ও বেআইনি ঘোষণা করা হবে না—তা জানতে চেয়েছেন আদালত।
-
তদন্ত প্রতিবেদন তলব: পুলিশের সংশ্লিষ্ট অতিরিক্ত আইজিপিকে (স্পেশাল ব্রাঞ্চ/ইমিগ্রেশন) অভিযোগের বিষয়টি তদন্ত করে আগামী ৭ দিনের মধ্যে আদালতে বিস্তারিত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। একইসঙ্গে পর্যাপ্ত আইনি কারণ ছাড়া ভবিষ্যতে ওই তিন নারীর বিদেশযাত্রায় যেন কোনো ধরনের বাধা না দেওয়া হয়, তারও কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষের পাল্টা ব্যাখ্যা:
ইমিগ্রেশন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দাবি, মানব পাচারের ঝুঁকি রোধে নেপালগামী যাত্রীদের কাগজপত্র বাড়তি গুরুত্ব দিয়ে যাচাই করা হয়। তাঁদের দাবি, ওই তিন নারী যে সেমিনারে অংশ নিতে যাচ্ছেন বলে জানান, তার আনুষ্ঠানিক নিমন্ত্রণপত্র ও হোটেল বুকিং প্রদেয় নথিতে অনুপস্থিত ছিল। তবে বিষয়টি আদালতে বিচারাধীন থাকায় পুলিশ সদর দপ্তর আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।
ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও সামাজিক প্রতিক্রিয়া:
ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর একাধিক নারী গণমাধ্যমকর্মী ও একা ভ্রমণকারী নারীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিয়ের কাবিননামা চাওয়া, স্বামীর অনুমতি বা পাসপোর্টে স্বামীর নাম না থাকার মতো নানা অযৌক্তিক প্রশ্নের মুখোমুখি হওয়ার তিক্ত অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন।
বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রতিটি নাগরিকের স্বাধীন চলাফেরা ও দেশত্যাগের মৌলিক অধিকার রয়েছে। সংবিধানের ২৭ ও ২৮ অনুচ্ছেদে লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং ‘বাংলাদেশ পাসপোর্ট অর্ডার, ১৯৭৩’-এ প্রাপ্তবয়স্ক নারীর ক্ষেত্রে অবিবাহিত হওয়া বা অভিভাবক ছাড়া ভ্রমণ বাধাগ্রস্ত করার কোনো বিধান নেই। আদালতের এই হস্তক্ষেপের পর ইমিগ্রেশন কর্মকর্তাদের জবাবদিহিতা ও ক্ষমতার সীমারেখা নিয়ে নতুন করে আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে।

