২০২৬ সালের প্রথম চার মাসে বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন অভিবাসন পথে প্রাণহানি ও নিখোঁজের সংখ্যা মারাত্মকভাবে বেড়েছে। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) সদ্য প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এই উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, চরম আবহাওয়া, সশস্ত্র সংঘাত, অর্থনৈতিক মন্দা ও অভিবাসন নীতির সাম্প্রতিক পরিবর্তনের প্রভাবেই ঝুঁকিপূর্ণ পথে পা বাড়াচ্ছেন অভিবাসীরা।
আইওএমের উপমহাপরিচালক উগোচি ড্যানিয়েলস বলেন, বিশ্বজুড়ে সাড়ে ৩০ কোটির বেশি আন্তর্জাতিক অভিবাসীর প্রায় অর্ধেকই মূলত নিজ অঞ্চলে উন্নত জীবনের খোঁজে যাতায়াত করেন। তবে অভিবাসীদের সুরক্ষায় একক কোনো দেশের উদ্যোগ যথেষ্ট নয়; জীবন বাঁচানো একটি বৈশ্বিক ও যৌথ দায়িত্ব।
বিভিন্ন রুটে অভিবাসীদের মৃত্যুর চিত্র
প্রতিবেদনে দেখা যায়, কিছু পথে মোট অভিবাসীর সংখ্যা কমলেও মৃত্যুর হার উল্টো জ্যামিতিক হারে বেড়েছে।
- মধ্য ভূমধ্যসাগরীয় পথ: এই পথে অভিবাসীদের আগমন ৪৬ শতাংশ কমে ৮,৫৭৭ জনে দাঁড়ালও মৃতের সংখ্যা ১১িল শতাংশ বেড়ে ৮২১ জনে পৌঁছেছে। কেবল জানুয়ারিতে আঘাত হানা ‘ঘূর্ণিঝড় হ্যারি’র কারণেই অর্ধেকের বেশি মৃত্যু ঘটে।
- পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় পথ: ক্রিট দ্বীপের উপকূলীয় দুর্যোগের কারণে এই পথে প্রাণহানি তিনগুণ বেড়ে ২৪৪ জনে গিয়ে ঠেকেছে।
- পশ্চিম ভূমধ্যসাগরীয় ও আটলান্টিক পথ: সেউতা ও মেলিয়ায় স্থলপথের যাতায়াত তিনগুণ বাড়ায় স্পেনে পৌঁছানো মানুষের সংখ্যা ৬৬ শতাংশ বেড়েছে। তবে যাত্রা শুরুর স্থান দক্ষিণে সরে যাওয়ায় ঝুঁকিপূর্ণ আটলান্টিক পথ ব্যবহার কমেছে ৭৮ শতাংশ।
রোহিঙ্গা সংকটে জাতিসংঘের জরুরি সতর্কতা
আইওএমের উদ্বেগের পাশাপাশি বাংলাদেশে আশ্রিত ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থীর মানবিক পরিস্থিতি নিয়ে সতর্ক করেছেন জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক বিশেষজ্ঞরা। জুন মাসের শেষ দিকে রাখাইন রাজ্য থেকে মালয়েশিয়াগামী ৫০০ মানুষের দুটি তরী ডুবে যাওয়ার ঘটনায় বহু প্রাণহানির পর এই বার্তা দেওয়া হয়।
জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালে সাড়ে ৬ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা সমুদ্রপথে ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রা শুরু করেন, যার মধ্যে প্রায় ৯০০ জন পথেই প্রাণ হারান যাদের ৬৬ শতাংশই ছিলেন নারী ও শিশু। আন্দামান সাগর ও বঙ্গোপসাগর পাড়ি দিতে গিয়ে প্রতি ৭ জন মানবের মধ্যে ১ জন নিখোঁজ বা মারা গেছেন, যা বিশ্বের অন্যান্য অভিবাসন পথের মধ্যে সর্বোচ্চ মৃত্যুর হার।
কক্সবাজার ও ভাসানচরের পরিস্থিতি
জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থার (ইউএনএইচসিআর) তথ্যানুযায়ী, কক্সবাজারের ৩৩টি জনাকীর্ণ শিবিরে বর্তমানে ১১ লাখ ৫৬ হাজার রোহিঙ্গা বসবাস করছেন, যার ৫২ শতাংশই শিশু। এ ছাড়া ভাসানচরে স্থানান্তর করা হয়েছে ৩৫ থেকে ৩৭ হাজার রোহিঙ্গাকে।
দেড় বছরের ব্যবধানে রাখাইন রাজ্যে নতুন করে বাড়তে থাকা সহিংসতার মুখে আরও প্রায় দেড় লাখ নতুন রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। কিন্তু বিশ্বব্যাপী তহবিল সংকটের ফলে তাদের খাদ্য, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা দিন দিন অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ছে।
মিয়ানমারে ২০২১ সালের সেনা অভ্যুত্থানের পর দেশে গৃহহীন হয়ে পড়েছে অন্তত ১৫ লাখ মানুষ। জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরা স্পষ্ট করেছেন, রোহিঙ্গা সংকটের একমাত্র স্থায়ী সমাধান হলো মিয়ানমারে তাদের নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও স্বতঃস্ফূর্ত প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করা।

