চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের শুরুতেই দেশের প্রধান বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী খাত তৈরি পোশাক রফতানিতে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা দিয়েছে। রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্যের ভিত্তিতে বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের সংকলিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে (জুলাই-আগস্ট) বিশ্ববাজারে ৭৪৯ কোটি ৫৬ লাখ ১০ হাজার ডলারের তৈরি পোশাক রফতানি হয়েছে। আগের অর্থবছরের একই সময়ে রফতানি হয়েছিল ৭১৩ কোটি ৬ লাখ ৭০ হাজার ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে রফতানি বেড়েছে ৫ দশমিক ১২ শতাংশ।
পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এই প্রবৃদ্ধিতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে যুক্তরাষ্ট্রের বাজার। পাশাপাশি প্রচলিত বাজারের বাইরে নতুন ও বিকল্প বাজারগুলোতেও রফতানি বাড়ছে। তবে বাংলাদেশের পোশাকের সবচেয়ে বড় বাজার ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) প্রবৃদ্ধির গতি তুলনামূলক ধীর হওয়ায় মোট রফতানিতে এই অঞ্চলের অংশ কিছুটা কমেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাড়ছে নির্ভরতা
চলতি অর্থবছরের জুলাই-আগস্ট সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ১৬১ কোটি ২৯ লাখ ২০ হাজার ডলারের পোশাক রফতানি হয়েছে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১১ দশমিক ৪২ শতাংশ বেশি। মোট রফতানিতেও যুক্তরাষ্ট্রের অংশ ২০ দশমিক ৩০ শতাংশ থেকে বেড়ে ২১ দশমিক ৫২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। তবে খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, কোনো একটি বাজারের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাই যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি অন্যান্য বিকল্প বাজারে অবস্থান আরও শক্তিশালী করার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
নিট পোশাকে বেশি প্রবৃদ্ধি
পণ্যভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, জুলাই-আগস্টে নিট পোশাক রফতানি ৬ দশমিক ১৭ শতাংশ বেড়ে ৪১৯ কোটি ৩৭ লাখ ৬০ হাজার ডলারে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে ওভেন পোশাক রফতানি ৩ দশমিক ৮১ শতাংশ বেড়ে হয়েছে ৩৩০ কোটি ১৮ লাখ ৫০ হাজার ডলার। বৈশ্বিক বাজারে ক্রেতাদের চাহিদার পরিবর্তন ও প্রতিযোগিতামূলক দামের কারণে ওভেনের তুলনায় নিট পোশাকের বাজার দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে।
ইউরোপে ধীরগতি ও বিকল্প বাজারের সম্ভাবনা
দেশের পোশাক রফতানির সবচেয়ে বড় বাজার ইইউভুক্ত দেশগুলোতে জুলাই-আগস্টে ৩৪৯ কোটি ৩৯ লাখ ১০ হাজার ডলারের পোশাক রফতানি হয়েছে। প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ২ দশমিক ৪৬ শতাংশ। ফলে মোট রফতানিতে ইউরোপের অংশ ৪৭ দশমিক ৮২ শতাংশ থেকে কমে ৪৬ দশমিক ৬১ শতাংশে নেমেছে। ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে জার্মানিতে প্রবৃদ্ধি মাত্র শূন্য দশমিক ৮৮ শতাংশ হলেও স্পেনে ১১ দশমিক ৬১ শতাংশ এবং নেদারল্যান্ডসে ৮ দশমিক ৪৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। তবে ফ্রান্সে রফতানি ৫ দশমিক ৩৯ শতাংশ ও পর্তুগালে ১৮ দশমিক ৯৩ শতাংশ কমেছে।
এদিকে প্রচলিত বাজারের বাইরের দেশগুলোতে রফতানি ৬ দশমিক ৪৮ শতাংশ বেড়ে ১২২ কোটি ৩১ লাখ ৯০ হাজার ডলারে দাঁড়িয়েছে। এর মধ্যে তুরস্কের বাজার প্রায় দ্বিগুণ হয়ে ৯ কোটি ৯৯ লাখ ৮০ হাজার ডলারে (৯৪ দশমিক ৬৮ শতাংশ বেশি) পৌঁছেছে। এছাড়া ব্রাজিলে ৩৪ দশমিক ৩৭ শতাংশ এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতে ২৪ দশমিক ২১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। তবে রাশিয়া, চীন ও ভারতে রফতানি কিছুটা কমেছে।
চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ করণীয়
৫ দশমিক ১২ শতাংশের এই প্রবৃদ্ধি স্বস্তিদায়ক হলেও একে দীর্ঘমেয়াদী নিশ্চয়তা হিসেবে দেখছেন না বিশেষজ্ঞরা। বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ, বন্দরের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং পরিবেশবান্ধব উৎপাদন মান নিশ্চিত করার তাগিদ দিয়েছেন তারা।
বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের শুরুতে রফতানির মূল ভরকেন্দ্র হয়ে উঠেছে যুক্তরাষ্ট্র ও নতুন গন্তব্যগুলো। ইউরোপীয় ইউনিয়ন এখনও আমাদের সবচেয়ে বড় বাজার হওয়ায় সেখানে প্রবৃদ্ধি ধরে রাখার পাশাপাশি নতুন বাজার সম্প্রসারণ—উভয় দিকেই সমান গুরুত্ব দিতে হবে।

