যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতের প্রভাবে বৈশ্বিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি এবং উর্ধ্বমুখী মূল্যস্ফীতির লাগাম টানতে তিন বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো নীতিগত সুদের হার বাড়িয়েছে মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ (ফেড)। আগামী নভেম্বরের গুরুত্বপূর্ণ মধ্যবর্তী নির্বাচনের মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই পদেক্ষেপ মার্কিন রাজনীতির মাঠে তীব্র উত্তাপ ছড়িয়েছে।
গত বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) ফেডের পলিসি মেকিং কমিটি সুদের হার ২৫ বেসিস পয়েন্ট বা ০.২৫ শতাংশ বৃদ্ধির পক্ষে সিদ্ধান্ত জানায়। এর ফলে বর্তমানে দেশটির সুদের হার দাঁড়িয়েছে ৩.৭৫ শতাংশ থেকে ৪ শতাংশে।
ট্রাম্পের তোপ ও ফেডের রাজনৈতিকীকরণ অভিযোগ
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরে দেশের অর্থনীতি চাঙা রাখতে এবং ঋণের খরচ কমাতে সুদের হার ১ শতাংশ বা তার নিচে নামিয়ে আনার দাবি জানিয়ে আসছিলেন। নির্বাচনে নামার ঠিক মুখে সুদের হার বাড়ানোর এই সিদ্ধান্তকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে অভিযোগ তুলেছেন ট্রাম্প।
উত্তর ক্যারোলিনায় এক নির্বাচনী সভায় বক্তব্য দিতে গিয়ে ট্রাম্প ফেড কর্মকর্তাদের কঠোর সমালোচনা করে বলেন, “ওরা একদল রাজনীতিবিদের মতো কাজ করছে। ট্রাম্প যেন নির্বাচনে সবচেয়ে খারাপ ফলাফল করে, সেটি নিশ্চিত করতেই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে তারা সুদের হার বাড়াল।”
পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ দেওয়া এক বার্তায় ট্রাম্প দ্রুত সুদের হার কমানোর দাবি জানিয়ে লেখেন, “যুক্তরাষ্ট্রে সুদের হার ১ শতাংশ বা তার কম হওয়া উচিত, কারণ আমরা বিশ্বের সেরা ঋণগ্রহীতা।”
সুদের হার বৃদ্ধির নেপথ্য নিয়ামক
সুদের হার কমানোর রাজনৈতিক চাপ থাকলেও ফেড চেয়ারম্যান কেভিন ওয়ার্শ ও পরিচালনা পর্ষদ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর অবস্থান নেন। ব্যাংকটির নীতিগত সিদ্ধান্তের নেপথ্যে কাজ করেছে মূলত চারটি প্রধান বিষয়:
-
জ্বালানি সংকট: মধ্যপ্রাচ্য সংকটের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রент ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০৯ ডলারে ঠেকেছে, যার প্রভাবে যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রোল ও ডিজেলের দাম রেকর্ড চূড়ায় পৌঁছেছে।
-
জটিল মূল্যস্ফীতি: গত আগস্টে সার্বিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়ায় ৩.৪ শতাংশে, যা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্ধারিত ২ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশ ওপরে।
-
শুল্ক ও এআই খাত: ডোনাল্ড ট্রাম্পের নতুন বাণিজ্য শুল্ক এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তিতে অতিরিক্ত বিনিয়োগ বাজারে নতুন মূলধন সৃষ্টি করায় পণ্যের দাম বাড়ছে।
-
বন্ড ইয়েল্ডের লাফ: ১০ বছর মেয়াদি মার্কিন ট্রেজারি বন্ডের ইয়েল্ড বেড়ে ৫.০২ শতাংশে পৌঁছেছে, যা ১৯ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ।
সাধারণ নাগরিক ও বাজারে প্রভাব
মার্কিন বিশেষজ্ঞদের মতে, সুদের হার এই মুহূর্তে বৃদ্ধির ফলে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত হবেন সাধারণ ভোক্তা ও ব্যবসায়ীরা:
| খাত | প্রভাবের ধরন |
| ব্যক্তিগত ঋণ ও বন্ধকি | গৃহঋণ (Mortgage), গাড়ি ঋণ এবং ক্রেডিট কার্ডের বন্ড সুদের হার সরাসরি বেড়ে যাবে। |
| কোরপোরেট বিনিয়োগ | ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যাংক থেকে নতুন মেয়াদে বাণিজ্যিক ঋণ নেওয়ার খরচ বৃদ্ধি পাবে। |
| ভবিষ্যৎ পূর্বাভাস | ফেড কর্তাদের বার্ষিক পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের আগে সুদের হার আরও একবার বৃদ্ধি পেতে পারে। |
রাজনৈতিক মহল ও বিশ্ব অর্থনীতির চোখ এখন ফেডের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে। হোয়াইট হাউসের অর্থনৈতিক পরিকল্পনা এবং ফেডের স্বাধীন নীতিমালার এই সংঘর্ষ আমেরিকান ভোটারদের মধ্যবর্তী নির্বাচনে কীভাবে প্রভাবিত করে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

