অস্ট্রেলিয়ার কুইন্সল্যান্ড অঙ্গরাজ্যের ফিৎসরয় নদী যেখানে ঘুরে বেড়ায় প্রায় ৫০০টি বিশালাকার নোনা পানির কুমির। কিছু কিছু কুমিরের দৈর্ঘ্য প্রায় ৪ মিটার (১৩ ফুট) পর্যন্ত। রোমাঞ্চকর হলেও সত্য, এই বিপজ্জনক নদীটিকেই ২০৩২ সালের ব্রিসবেন অলিম্পিক ও প্যারা অলিম্পিকের রোয়িং এবং ক্যানো স্প্রিন্ট ইভেন্টের মূল ভেন্যু হিসেবে চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটি (IOC) এবং আন্তর্জাতিক রোয়িং সংস্থা (World Rowing)।
প্রকৌশল মূল্যায়ন ও নদীর তলদেশের গতিপ্রকৃতি পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে সম্প্রতি স্থানটিকে প্রতিযোগিতার জন্য নিরাপদ ও উপযুক্ত হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।
আসল ভয় কুমির নাকি স্রোত?
নদীতে বিশালাকার বিপজ্জনক কুমিরের উপস্থিতি সংবাদমাধ্যমের নজর কাড়লেও আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটি এবং বিশ্বের শীর্ষ রোয়ারদের মূল দুশ্চিন্তা কিন্তু কুমির নিয়ে নয়। তাদের প্রধান উদ্বেগ নদীর প্রাকৃতিক গঠন ও জোয়ার-ভাটার স্রোত নিয়ে।
-
স্রোত ও ‘ন্যায্যতার’ সংকট: অলিম্পিক পদকজয়ী অস্ট্রেলিয়ান রোয়ার ড্রিউ গিনের মতে, নদীর প্রাকৃতিক বাঁক ও জোয়ার-ভাটার জোরালো স্রোতের কারণে বিভিন্ন লেনে থাকা প্রতিযোগীরা সমান সুযোগ পাবেন না, যা অলিম্পিকের মতো সর্বোচ্চ প্রতিযোগিতার “ন্যায্যতা ও স্বকীয়তা” নষ্ট করতে পারে।
-
বন্যার ঝুঁকি: অঞ্চলটিতে হঠাৎ প্রাকৃতিক বন্যার ইতিহাস রয়েছে। এমনকি ২০২৪ সালেও একটি স্কুল স্তরের রোয়িং প্রতিযোগিতা আয়োজনের সময় নদীর কোর্স ভেসে যাওয়ায় টুর্নামেন্টটি অন্য জায়গায় সরিয়ে নিতে হয়েছিল।
-
দূরত্ব ও লজিস্টিকস: মূল অলিম্পিক শহর ব্রিসবেন থেকে প্রায় ৬০০ কিলোমিটার দূরে আঞ্চলিক শহর রকহ্যাম্পটনে বিশ্বের অ্যাথলেটদের নিয়ে যাওয়া কতটা যুক্তিযুক্ত, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে ইউরোপের বেশ কয়েকটি দেশ।
‘অভিজাতদের কাদা ছোড়াছুড়ি’ বনাম আয়োজকদের জেদ
আন্তর্জাতিক বিভিন্ন স্পোর্টস ফেডারেশনের এই আপত্তির কড়া জবাব দিয়েছেন কুইন্সল্যান্ডের প্রিমিয়ার ডেভিড ক্রিসাফুলি। তিনি এই সমালোচনাকে “আন্তর্জাতিক ও আন্তঃরাজ্য অভিজাতদের সস্তা বুলিং” বলে আখ্যা দিয়েছেন।
তিনি স্পষ্ট জানান, আঞ্চলিক কুইন্সল্যান্ডের মানুষের অধিকার ও উন্নয়ন নিশ্চিতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এবং ফিৎসরয় নদী কারিগরি পরীক্ষায় ‘লেটার মার্কস’ পেয়ে পাশ করেছে। সিডনি ২০০০ অলিম্পিকের রোয়িং কোর্স বিকল্প হিসেবে তৈরি থাকলেও সেখান থেকে খেলা সরাতে একেবারেই নারাজ স্থানীয় সরকার।
কুমির তাড়াতে “Crocodile, Crocodile, Crocodile!”
যদিও গত ৪০ বছরে এই নদীতে কুমির কর্তৃক মানুষের ওপর হামলার কোনো নথিবদ্ধ ইতিহাস নেই, তবুও প্রাক-অলিম্পিক ও স্থানীয় প্রতিযোগিতাগুলোতে কঠোর সুরক্ষা মেনে চলা হচ্ছে।
নদীতে অনুশীলন বা প্রতিযোগিতার সময় কুমির দেখা গেলেই লাল পতাকা উড়িয়ে এবং “Crocodile, Crocodile, Crocodile” বলে উচ্চশব্দে বিশেষ সতর্ক সংকেত দেওয়া হয়, যাতে প্রতিযোগীরা সাথে সাথে নৌকা নিয়ে ডাঙায় উঠে আসতে পারেন।
সব আশঙ্কা ও বিতর্ক একপাশে সরিয়ে আইওসির সবুজ সংকেত মেলায় ২০৩২ ব্রিসবেন অলিম্পিকের অন্যতম রোমাঞ্চকর আকর্ষণ হতে যাচ্ছে এই ফিৎসরয় নদী।

