অপরাধ দমনের নামে দেশে একসময় বহুল আলোচিত ও বিতর্কিত ‘ক্রসফায়ার’ বা ‘বন্দুকযুদ্ধ’ পুরোপুরি বন্ধ থাকলেও সম্প্রতি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে অপরাধীদের তৎপরতা বৃদ্ধি পেয়েছে। এ অবস্থায় কঠোর হাতে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ, অপরাধীদের দ্রুত জামিন রোধ এবং জনমনে পুলিশের প্রতি আস্থা ফিরিয়ে আনতে বিশেষ ক্ষমতা আইনে আসামীদের ‘ডিটেনশনে’ নেওয়ার কঠোর প্রস্তাব উঠেছে পুলিশ সদর দফতরে।
মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) পুলিশ সদর দফতরে আইজিপি আলী হোসেন ফকিরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত উচ্চপর্যায়ের ‘মর্নিং মিটিং’-এ পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তারা এ বিষয়ে বিশদ আলোচনা ও প্রস্তাব পেশ করেন। সভায় অতিরিক্ত আইজিপি, সকল ইউনিট প্রধান, ডিআইজি (ক্রাইম) ও ডিআইজি (প্রশাসন)-সহ জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা অংশ নেন।
বৈঠকে যেসব মূল প্রস্তাব ও পর্যবেক্ষণ উঠে আসে:
১. ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনে ‘ডিটেনশন’:
অতিরিক্ত আইজিপি খোন্দকার রফিকুল ইসলাম ও সিআইডি প্রধান ব্যারিস্টার মোহাম্মদ মোশাররফ হোছাইন মত দেন যে, বর্তমানে ‘ক্রসফায়ার’ না থাকায় অপরাধীরা ভয় পাচ্ছে না। ফলে ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনের অধীনে দুর্ধর্ষ অপরাধীদের ‘ডিটেনশন’ দেওয়া যেতে পারে। তবে ঢালাওভাবে আটক না করে সুনির্দিষ্ট অপরাধের ডেটাবেজ তৈরি করে আইনি প্রক্রিয়ায় ডিটেনশনে নেওয়ার জোর তাগিদ দেন রেলওয়ে পুলিশ প্রধান ব্যারিস্টার জিল্লুর রহমান।
২. আইনি সীমাবদ্ধতা ও দ্রুত জামিন রোধ:
আইনি বাধ্যবাধকতা (যেমন—১২০ দিনের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দিতে না পারা বা নির্ধারিত সময়ে বিচার সম্পন্ন না হওয়া) এবং তদন্তে দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে চিহ্নিত আসামিরা আদালত থেকে সহজে জামিন পেয়ে যাচ্ছে। আইনি ফাঁকফোকর বন্ধ করে জামিন রোধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়।
৩. মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি) পুলিশের অধীনে আনা:
ডিএমপি কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদ ও হাইওয়ে পুলিশ প্রধান ফারুক আহমেদ জানান, মাদকের বিস্তারই বেশিরভাগ অপরাধ ও কিশোর গ্যাংয়ের আধিপত্যের মূল কারণ। সভায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে পুলিশের একজন অতিরিক্ত আইজিপিকে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) মহাপরিচালক (ডিজি) পদে নিয়োগ দিয়ে সরাসরি পুলিশি কমান্ডে আনার প্রস্তাব করা হয়।
৪. বাহিনীর অভ্যন্তরীণ ‘স্ট্রিমলাইনিং’ ও সরাসরি জনসংযোগ:
পুলিশে নানা মনস্তাত্ত্বিক চাপ ও গুঞ্জন কাটিয়ে ২ লাখ ৩০ হাজার সদস্যের এই বিশাল বাহিনীকে ‘স্ট্রিমলাইনিং’ বা সুসংগঠিত করার জোর দেওয়া হয়। কেবল অপরাধের সংখ্যাতাত্ত্বিক হিসাব নয়, সরাসরি জনসংযোগ বাড়িয়ে জনগণের সঙ্গে হারিয়ে যাওয়া আস্থার সম্পর্ক পুনর্গঠনের আহ্বান জানানো হয়।
অপরাধ পর্যালোচনায় সাম্প্রতিক ঘটনা ও আইজিপির কঠোর নির্দেশনা
সভায় সম্প্রতি ঘটে যাওয়া বেশ কিছু স্পর্শকাতর ও আলোচিত ঘটনা পর্যালোচনা করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে—রাড্ডা হেলথ সেন্টারে হামলা, মোহাম্মদপুর ও নিউগিনি প্রোপার্টিজে সশস্ত্র হামলা, কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিও ভাঙচুর, প্রিজনভ্যান থেকে শীর্ষ মাদক কারবারি ‘পিচ্চি রাজা’র পলায়ন, চট্টগ্রামে কিশোর গ্যাংয়ের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ, কুমিল্লার লালমাই পাহাড়ে স্কুলছাত্র হত্যা এবং দেশের বিভিন্ন স্থানে জমি দখল ও চলন্ত বাসে অগ্নিকাণ্ডের মতো বিষয়সমূহ।
পরবর্তীতে আয়োজিত মাসিক ‘ক্রাইম কনফারেন্স’-এ আইজিপি আলী হোসেন ফকির জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা করেন। তিনি স্পষ্ট জানান—মাদক ব্যবসায়ী, সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজদের ক্ষেত্রে কোনো রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা করা যাবে না। পাশাপাশি কিশোর অপরাধীদের আশ্রয়দাতা প্রভাবশালী নেতাদের চিহ্নিত করা, গুজবের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক আইনি পদক্ষেপ এবং মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব পালনে পুলিশ সদস্যদের বাধ্যতামূলক ‘বডি ওর্ন ক্যামেরা’ ব্যবহারের নির্দেশ দেওয়া হয়।

