দীর্ঘ ১৪ বছরের নির্মাণকাজ, তীব্র যানজটের ভোগান্তি এবং ২ হাজার ৮১১ কোটি টাকা ব্যয়ের পর অবশেষে বাতিল হলো ঢাকা-গাজীপুর বাস র্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) প্রকল্প। নির্মিত বিশেষ বাস লেন ও স্টেশন অবকাঠামো অপসারণ করে পুরো সড়কটিকে চার থেকে ছয় লেনের সাধারণ মহাসড়কে রূপান্তরের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।
সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ‘গ্রেটার ঢাকা সাসটেইনেবল আরবান ট্রান্সপোর্ট প্রজেক্ট’ নামের এই প্রকল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে আলোচনা করে আইনি জটিলতা নিরসনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এছাড়া বিআরটি পরিচালনার জন্য গঠিত ‘ঢাকা বাস র্যাপিড ট্রানজিট কোম্পানি’ বন্ধ করে এর সকল কার্যক্রম সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের (সওজ) আওতায় নেওয়া হচ্ছে।
প্রকল্পের পটভূমি ও ব্যয়ের চিত্র:
-
অনুমোদন ও বাজেট: ২০১২ সালে ২ হাজার ৩৯ কোটি টাকা প্রাথমিক বাজেটে প্রকল্পটি একনেকে অনুমোদন পায়। পরবর্তীতে মেয়াদ বাড়িয়ে ব্যয় ধরা হয়েছিল ৬ হাজার ৫৯৭ কোটি টাকা।
-
প্রকৃত ব্যয়: প্রকল্প সম্পূর্ণ শেষ হওয়ার আগেই এ পর্যন্ত ২ হাজার ৮১১ কোটি টাকা খরচ হয়েছে।
-
মূল লক্ষ্য: বিমানবন্দর থেকে গাজীপুরের শিববাড়ি পর্যন্ত ২০ কিলোমিটার পথে পৃথক লেনে দ্রুতগতির বাস চালিয়ে ৩০ মিনিটে যাতায়াত নিশ্চিত করার পরিকল্পনা ছিল।
পরিকল্পনাহীনতা ও দুর্ঘটনার ইতিহাস:
পর্যাপ্ত সমীক্ষাহীনতা, সমন্বয়হীনতা ও নকশাগত ত্রুটির কারণে নির্ধারিত সময়ের চেয়ে বহু বছর পিছিয়ে পড়ে প্রকল্পটি। নির্মাণকাজ চলায় গত ১৪ বছর ধরে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে তীব্র যানজট ও ধুলোবালিতে চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে পোশাক শ্রমিকসহ লাখ লাখ যাত্রীকে। এছাড়া নির্মাণকাজে সুরক্ষাব্যবস্থার অভাবে ক্রেন দুর্ঘটনা ও লঞ্চিং গার্ডার ধসে নিরাপত্তারক্ষী ও পথচারীসহ অন্তত সাতজনের প্রাণহানি ঘটে।
বর্তমান সিদ্ধান্ত ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া:
সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ থেকে জারি করা চিঠিতে জানানো হয়েছে, সড়কের মাঝখানে থাকা সিমেন্টের প্রতিবন্ধক, লোহার বেড়া এবং নির্মাণাধীন ১৫টি বাস স্টেশন অপসারণ করা হবে। স্টেশনগুলোতে থাকা লিফট ও চলন্ত সিঁড়ি সওজের অন্য কোনো প্রকল্পে ব্যবহারের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। সিদ্ধান্তের বাস্তবায়ন অগ্রগতি আগামী ১৫ দিনের মধ্যে মন্ত্রণালয়কে জানাতে হবে এবং কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত প্রতি মাসের ৩ তারিখের মধ্যে রিপোর্ট জমা দিতে হবে।
মিশ্র প্রতিক্রিয়া:
প্রকল্প বাতিলের সিদ্ধান্তের পর স্থানীয় রাজনীতি ও সুশীল সমাজে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। গাজীপুর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ও মহানগর বিএনপির সভাপতি শওকত হোসেন সরকার এ সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, “প্রকল্পটি ফ্যাসিবাদের লুটপাটের খাত ছিল, এটি অপসারণে যাত্রীদের দীর্ঘদিনের কষ্ট দূর হবে।”
অন্যদিকে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর গাজীপুর সাধারণ সম্পাদক ইফতেখার শিশির বলেন, “জনগণের করের বিপুল টাকা অপচয়ের পর প্রকল্প বন্ধের সিদ্ধান্ত হতাশাজনক। এর সঙ্গে জড়িত দুর্নীতি ও ব্যর্থতার আইনি জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।” তবে গাজীপুর মহানগর জামায়াতের আমীর অধ্যাপক জামাল উদ্দিন মন্তব্য করেন, প্রকল্প সম্পূর্ণ বাতিল না করে উন্নত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে চালু করা গেলে অর্থের অপচয় রোধ করা যেত।
গাজীপুর সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী তানভীর আহমেদ জানান, সরকারের আনুষ্ঠানিক লিখিত নির্দেশনার চিঠি পেলেই অপসারণ ও সড়ক সংস্কারের কাজ শুরু করা হবে।

