ফ্রান্স, ইতালি ও স্পেনের পর এবার ইউরোপের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কেন্দ্র জার্মানিতেও তরুণদের আন্দোলনের ঢেউ আছড়ে পড়তে চলেছে। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, শিক্ষাব্যবস্থার সংকট ও ভবিষ্যত নিয়ে শঙ্কার জেরে জার্মানির প্রায় ৩০টি শহরে রাজপথে নামার ঘোষণা দিয়েছে দেশটির যুবসমাজ। শনিবারের (৩১ অক্টোবর) এই বিক্ষোভ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে ইতোমধ্যে দেশজুড়ে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
কেন রাস্তায় নামছে ‘জেন জি’?
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম টিকটক, ইনস্টাগ্রাম এবং টেলিগ্রামের মাধ্যমে সংগঠিত হয়ে ‘জেন জি রেগেল্ট’ (Gen Z regelt) নামের একটি নতুন উদ্যোগের ব্যানারে এই কর্মসূচির ডাক দেওয়া হয়েছে। মূলত ফ্রান্সসহ অন্যান্য ইউরোপীয় দেশের শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানিয়ে তরুণরা এই পথ বেছে নিয়েছে।
তাদের প্রধান দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—
-
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র এবং মানসিক স্বাস্থ্যসেবায় বাজেট বরাদ্দ বাড়ানো।
-
জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো এবং তরুণ প্রজন্মের ওপর থেকে অর্থনৈতিক চাপ কমানো।
-
বাধ্যতামূলক সামরিক সেবা (Wehrpflicht) চালুর সিদ্ধান্ত বাতিল করা।
-
নজরদারি বৃদ্ধি ও মৌলিক অধিকার খর্ব করার নীতিমালার বিরোধিতা।
-
জলবায়ু সুরক্ষায় কার্যকর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ গ্রহণ।
বার্লিনের ফ্রাই ইউনিভার্সিটির শান্তি ও সংঘাত গবেষণা কেন্দ্রের গবেষক ইয়ানিস ইউলিয়ান গ্রিমের মতে, ইউরোপের বয়োবৃদ্ধ সমাজব্যবস্থায় তরুণদের রাজনৈতিক প্রভাব দিন দিন কমে আসছে, যা মূলত বর্তমান প্রজন্মের মধ্যে তীব্র হতাশা ও ক্ষোভের জন্ম দিচ্ছে।
সহিংসতার আশঙ্কা ও প্রশাসনের প্রস্তুতি:
ফ্রান্স, ইতালি কিংবা আলবেনিয়ায় সাম্প্রতিক বিক্ষোভের সময় সহিংসতা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটায় জার্মানিতেও বড় ধরনের শঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ব্যবসায়িক ও খুচরা বিক্রেতা সংগঠনগুলো দোকানপাট ও বিপণিবিতান সুরক্ষায় সরকারের কাছে কড়া নিরাপত্তা দাবি করেছে।
তবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এখন পর্যন্ত জার্মানিতে ফ্রান্সের মতো বড় ধরনের সহিংসতার কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য বা গোয়েন্দা প্রতিবেদন তাদের হাতে নেই। তা সত্ত্বেও যেকোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে বার্লিন, ফ্রাঙ্কফুার্ট, মিউনিখ ও কোলনসহ বড় শহরগুলোতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
সংগঠনগুলোর দূরত্ব ও অভ্যন্তরীণ বিতর্ক:
আন্দোলনের পেছনের কাঠামোগত স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে জার্মানির মূলধারার ছাত্রসংগঠনগুলো। নির্দিষ্ট কোনো সুনির্দিষ্ট নেতৃত্ব বা আনুষ্ঠানিক কাঠামো না থাকায় কেন্দ্রীয় ছাত্রসংগঠনগুলো এই কর্মসূচি থেকে নিজেদের দূরে সরিয়ে নিয়েছে এবং আগামী ২০ নভেম্বর বার্লিনে পৃথক কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। এছাড়া, আন্দোলনের কেন্দ্রীয় মুখপাত্র গিয়ান্নি মাতেইয়াও সম্প্রতি পদত্যাগ করায় আয়োজকদের অভ্যন্তরীণ প্রস্তুতি কিছুটা ধাক্কা খেয়েছে।
তবে আন্দোলনকারীরা তাদের ওয়েবসাইটে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে, তাদের এই কর্মসূচি সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ, গণতান্ত্রিক ও সব ধরনের উগ্রবাদ বা সহিংসতার বিরুদ্ধে। গ্রিন পার্টির মতো রাজনৈতিক দলগুলোও তরুণদের যৌক্তিক দাবিগুলোকে দমন না করে গুরুত্ব দিয়ে শোনার আহ্বান জানিয়েছে। শেষ পর্যন্ত শনিবারের এই আন্দোলন জার্মানির রাজনৈতিক অঙ্গনে কতটা প্রভাব ফেলে, এখন সেদিকেই তাকিয়ে রয়েছে পুরো দেশ।

