বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশি শ্রমিকদের মৃত্যুর সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে অর্থাৎ ২৭৩ দিনে দেশে এসেছে ৪ হাজার ৬০টি মরদেহ। এই পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গড়ে প্রতিদিন ১৪ জনেরও বেশি কর্মীর নিথর দেহ দেশে ফিরছে। পরিসংখ্যান বলছে, কর্মস্থলে দুর্ঘটনায় মৃত্যু এবং প্রবাসে দীর্ঘস্থায়ী জটিলতায় প্রাণহানির ঘটনা বাড়ছে। সৌদি আরবে কিছু কর্মীকে দাফন করা হয় স্থানীয়ভাবে। তবে অধিকাংশ মরদেহ দেশে আনতে চায় পরিবার।
প্রবাসে মৃত্যুবরণ করা কর্মীদের মরদেহ দেশে আনার প্রক্রিয়ায় হয়রানির অভিযোগ নতুন নয়। পাবনার আল আমিনের মরদেহ দেশে ফিরতে সময় লেগেছে প্রায় দেড় বছর। তিনি কম্বোডিয়ার একটি টাইলস কারখানায় কর্মরত অবস্থায় শতাধিক টাইলসের নিচে চাপা পড়ে মৃত্যুবরণ করেন ২০২৫ সালের ১২ এপ্রিল। তার মরদেহ দেশে পৌঁছায় চলতি বছরের ২৭ সেপ্টেম্বর। আল আমিনের মৃত্যুর পর তার শ্যালক মাসুম খান ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডে সাহায্যের জন্য আবেদন করেন। তবে কম্বোডিয়ায় বাংলাদেশের দূতাবাস না থাকায় প্রক্রিয়াটি থাইল্যান্ডের মাধ্যমে সম্পন্ন করতে হয়, যা বেশ জটিল ছিল। মরদেহটি কোথায় আছে, তা খুঁজে বের করতে পারেনি দূতাবাস। এটি জানতে পেরে তিনি প্রবাসীদের মাধ্যমে দেশটির স্থানীয় পুলিশের নম্বর সংগ্রহ করে কল্যাণ বোর্ডকে সহায়তা করেন। বোর্ডের কর্মকর্তারা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে মরদেহ আনার আগে একাধিক দপ্তর থেকে অনুমোদন নিতে হয়।
ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০১৯ সালে দেশে ফিরেছিল ৩ হাজার ৬৫১ প্রবাসীর মরদেহ। ২০২০ সালে এই সংখ্যা কিছুটা কমে ৩ হাজার ১৪০ জনে নেমে আসে। তবে ২০২১ সাল থেকে মরদেহের সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে বাড়তে থাকে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, মধ্যপ্রাচ্যে অবকাঠামো নির্মাণ খাতে নিয়োজিত বাংলাদেশি কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং পেশাগত ঝুঁকির বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধির অভাব এই প্রাণহানির অন্যতম কারণ।
প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্তরা জানান, মরদেহ দেশে আসার পর প্রতিটি পরিবারকে দাফনের জন্য ৩৫ হাজার টাকা নগদ সহায়তা ও পরবর্তী সময়ে ৩ লাখ টাকা করে অনুদান প্রদান করা হয়। তবে ক্ষতিপূরণ ও বিমাসুবিধা নিয়ে প্রবাসীদের পরিবারের পক্ষ থেকে নিয়মিত অভিযোগ পাওয়া যায়। বিশেষ করে অসম্পূর্ণ কাগজপত্রের কারণেও অনেক সময় মরদেহ আনা ও সহায়তা প্রাপ্তিতে দেরি হয়। নিয়মিত কর্মী হলে মরদেহ মোটামুটি সময়মতো দেশে আসে; কিন্তু কর্মী কোনো কারণে অনিয়মিত হয়ে গেলে (বৈধ কাগজ না থাকা) দীর্ঘ সময় লেগে যায় মরদেহ আনতে।
বর্তমানে ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড প্রবাসীদের মৃত্যুর কারণ হিসেবে সড়ক দুর্ঘটনা, অগ্নিকাণ্ড, ভবন থেকে পতন এবং শারীরিক অসুস্থতাকে চিহ্নিত করেছে। ২০১৮ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছরের মৃত্যুর কারণ বিশ্লেষণে দেখা গেছে, তরুণ কর্মীদের মৃত্যুর হার অনেক বেশি। সাধারণত ২৫ থেকে ৩০ বছর বয়সী কর্মীদের এই খাতের বড় অংশজুড়ে কাজের ঝুঁকি নিতে দেখা যায়। কল্যাণ বোর্ড থেকে আবেদনটি পাঠানো হয় থাইল্যান্ডে।
অন্যদিকে দেশের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়েও বিভিন্ন মহলে আলোচনার ঝড় উঠেছে। সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে পরামর্শক ব্যয় সংকোচন ও শুল্ক সুবিধা পর্যালোচনার দাবি জোরালো হচ্ছে। একই সঙ্গে বিমানবন্দরগুলোতে চোরাচালান রোধে কঠোর নজরদারি ও এয়ারলাইনসগুলোর কার্গো অংশে তল্লাশি বাড়ানোর তাগিদ দেওয়া হয়েছে। শাহজালাল বিমানবন্দরে প্রায়ই উড়োজাহাজের কার্গো ও টয়লেট প্যানেল থেকে অবৈধ সোনা উদ্ধারের ঘটনা ঘটছে, যা বিমান খাতের নিরাপত্তার অভাবকেই সামনে নিয়ে আসছে।
শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতেও নানা চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান। বিশেষ করে ডেঙ্গু মোকাবিলায় যথাযথ নির্দেশিকা পালন না করায় পরিস্থিতি ভয়ংকর রূপ নিচ্ছে। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এখন হাসপাতাল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মশা নিধনের নতুন পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। এছাড়া বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে অনিয়মের অভিযোগ ও শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের কর্মস্থলে ফেরা নিয়ে আইনি পর্যবেক্ষণের বিষয়গুলোও গুরুত্ব পাচ্ছে।
পরিকল্পনা কমিশন নতুন কারিগরি ও ভাষাগত দক্ষতা উন্নয়ন প্রকল্প নিয়ে কাজ করছে, যেখানে বেকারপ্রতি দেড় লাখ টাকা ব্যয়ের প্রস্তাব করা হয়েছে। সমবায়ের মাধ্যমে দক্ষ জনবল তৈরির এই উদ্যোগে কাজের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার তাগিদ এসেছে। সামগ্রিকভাবে জনশক্তি রপ্তানি, স্থানীয় প্রশাসন ও উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর সমন্বয়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

