অর্থনৈতিক মন্দা, জীবনযাত্রার আকাশচুম্বী ব্যয় এবং শিক্ষাব্যবস্থার ভঙ্গুর দশাকে কেন্দ্র করে সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি শুরু হওয়া শিক্ষার্থী ও গণবিক্ষোভ এখন ফ্রান্সজুড়ে এক নজিরবিহীন রাজনৈতিক সংকট ও দাঙ্গায় রূপ নিয়েছে। প্যারিসের ঐতিহাসিক রাস্তা থেকে শুরু করে লিমোজের শতবর্ষী সিটি হল ধসে পড়া পর্যন্ত পরিস্থিতির অবনতি ঘটার পর ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ ও তাঁর মধ্যপন্থি শাসনব্যবস্থা গভীর চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
২০২৭ সালের প্রারম্ভেই অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ফরাসি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের প্রশ্ন—তবে কি ম্যাক্রোঁর মধ্যপন্থার পতন ঘটছে এবং উগ্র ডান বা উগ্র বামপন্থিদের উত্থান সুনিশ্চিত হচ্ছে?
ম্যাক্রোঁ ও মধ্যপন্থিদের সামনে মূল সংকটগুলো:
-
তরুণ ও জেন-জি (Gen-Z) ভোটারদের চরম আস্থাহীনতা: শিক্ষায় বাজেট সংকট, শিক্ষক স্বল্পতা এবং উচ্চশিক্ষায় ভর্তির বিতর্কিত ব্যবস্থা ‘পারকুরসুপ’ (Parcoursup)-এর বিরুদ্ধে শুরু হওয়া এই আন্দোলনে ফ্রান্সের তরুণ প্রজন্ম রাজপথে নেমে এসেছে। প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁর গত রবিবারের ভাষণে শাস্তিমূলক ব্যবস্থার তাগিদ থাকলেও তরুণদের মৌলিক দাবি পূরণের কোনো স্পষ্ট রূপরেখা ছিল না, যা তাদের আরও ক্ষুব্ধ করে তুলেছে।
-
অর্থনৈতিক হাত-পা বাঁধা পরিস্থিতি: ২০১৮ সালের ‘ইয়েলো ভেস্ট’ (Yellow Vests) আন্দোলনের সময় ম্যাক্রোঁ সরকার বিপুল পরিমাণ আর্থিক প্রণোদনা ও ছাড় দিয়ে পরিস্থিতি শান্ত করেছিলেন। তবে বর্তমানে ফ্রান্সের বাজেট ঘাটতি জিডিপির ৫.১ শতাংশে পৌঁছেছে (যেখানে ইউরোপীয় ইউনিয়নের গড় ৩.১%)। ফলে রাজকোষ খালি থাকায় আন্দোলনকারীদের শান্ত করতে সরকারি অর্থ ঢালার সুযোগ এবার সরকারের নেই।
-
সংবিধান অনুযায়ী ক্ষমতার শেষ মেয়াদ: দুই মেয়াদে দায়িত্ব পালনের কারণে প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁ সংবিধান অনুযায়ী আগামী নির্বাচনে আর প্রার্থী হতে পারছেন না। ফলে তাঁর মধ্যপন্থি দল ‘রেনেসাঁ’ এখন অভ্যন্তরীণ নেতাসংকট এবং চরম জনরোষের মুখে দিশেহারা।
নির্বাচনী সমীকরণ: ফায়দা লুটছে কারা?
সাম্প্রতিক রাজনৈতিক মেরুকরণ ও জরিপের তথ্য অনুযায়ী, মধ্যপন্থিদের পিছু হটার সুযোগে ফরাসি রাজনীতির দুই প্রান্ত শক্তিশালী হয়ে উঠছে:
১. পপুলিস্ট চরম-বাম (ফ্রান্স আনবাউড – LFI):
জ্যঁ-লুক মেলঁশোঁর নেতৃত্বাধীন এই দলটি শিক্ষার্থী ও শ্রমিক আন্দোলনকে প্রকাশ্য সমর্থন জোগাচ্ছে। শিক্ষায় বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও পারকুরসুপ বাতিলের প্রতিশ্রুতির কারণে ১৮ থেকে ২৪ বছর বয়সী তরুণদের মধ্যে মেলঁশোঁর সমর্থন লাফিয়ে ৪৯ শতাংশে পৌঁছেছে। তরুণ প্রজন্ম ম্যাক্রোঁর নীতিকে প্রত্যাখ্যান করতে বিকল্প হিসেবে মেলঁশোঁকে বেছে নিচ্ছে।
২. চরম-ডানপন্থি ন্যাশনাল র্যালি (RN):
মারিন লো পেন এবং জর্ডান বারদেল্লার দল এই চলমান অরাজকতাকে ‘আইনশৃঙ্খলার চরম বিপর্যয়’ হিসেবে তুলে ধরছেন। দেশের মধ্যবিত্ত ও জ্যেষ্ঠ নাগরিকদের কাছে ‘শান্তি ও কর্তৃত্ব’ ফিরিয়ে আনার আশ্বাস দিয়ে লো পেন বর্তমানে ৩২ শতাংশ সমর্থন নিয়ে প্রেসিডেন্ট পদের দৌড়ে শীর্ষ স্থানে রয়েছেন। তরুণ ভোটারদের পছন্দের তালিকাতেও দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে তাঁর দল।
পতনের মুখে কি মধ্যপন্থা?
বিশ্লেষকদের মতে, ম্যাক্রোঁর পতন বা তাঁর মধ্যপন্থি ধারার বিলুপ্তি বলতে মূলত বোঝায়—ফ্রান্সের রাজনীতির ঐতিহ্যবাহী দ্বিমেরু বা কেন্দ্রভিত্তিক রাজনীতির ভারসাম্য ভেঙে পড়া।
আগামী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ফরাসি ভোটাররা মধ্যপন্থার ওপর আস্থা হারিয়ে দুটি চরমপন্থার (উগ্র বাম বনাম উগ্র ডান) মুখোমুখি হতে যাচ্ছেন। তরুণ সমাজের তীব্র ক্ষোভ এবং অপরিশোধিত অর্থনৈতিক সংকটের কারণে আগামী নির্বাচনে ফ্রান্সের সরকারে চরমপন্থী বা পপুলিস্ট শক্তির আসা এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র।

