একসময় বিশেষ আয়োজন, অতিথি আপ্যায়ন কিংবা উৎসব-পার্বণে সুগন্ধি চালের পোলাও-বিরিয়ানি ছিল বাঙালি গৃহস্থের অতি পরিচিত দৃশ্য। তবে মাত্র ছয় মাসের ব্যবধানে সেই সুগন্ধি চাল এখন সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে। রাজশাহীর বাজারে বিভিন্ন জাতের সুগন্ধি চালের দাম বেড়ে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। বর্তমানে প্রতি কেজি প্যাকেটজাত চিনিগুঁড়া চাল মানভেদে ২২০ থেকে ২৩০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে, যা ছয় মাস আগেও ছিল ১৩৫ থেকে ১৪০ টাকা।
হঠাৎ চালের এই আকাশছোঁয়া দামে ক্ষোভ ও বিস্ময় প্রকাশ করেছেন ক্রেতারা। নগরীর সাহেববাজারে পোলাওয়ের চাল কিনতে আসা বেসরকারি চাকুরিজীবী জাহাঙ্গীর আলম খান বলেন, “পাঁচ মাস পর চাল কিনতে এসে হতভম্ব হয়ে গেছি। আগে যে চাল ১৪০ টাকায় কিনেছি, এখন তা ২৩০ টাকা। এত দাম জীবনেও দেখি নাই।”
বাজারের বর্তমান চিত্র
রাজশাহীর পাইকারি ও খুচরা বাজারে গত তিন থেকে ছয় মাসে সুগন্ধি চালের দামে বড় ধরনের লাফ দেখা গেছে:
-
প্যাকেটজাত চিনিগুঁড়া চাল: ১৩৫-১৪০ টাকা থেকে বেড়ে ২৩০ টাকা কেজি।
-
খোলা চিনিগুঁড়া চাল: ১১৫-১২০ টাকা থেকে বেড়ে ১৭০-১৮০ টাকা (পাইকারিতে ১৬০-২০০ টাকা)।
-
দেশি কালিজিরা চাল: ১২০-১২৫ টাকা থেকে বেড়ে ১৬০ টাকা কেজি।
-
কাটারিভোগ চাল: কেজিতে ১৫ টাকা বেড়ে ৯৫ থেকে ১০৫ টাকা।
মূল্যবৃদ্ধির কারণ কী?
চালের হঠাৎ দরবৃদ্ধির পেছনে ব্যবসায়ী ও কৃষি সংশ্লিষ্টরা একাধিক কারণ চিহ্নিত করেছেন:
১. বিদেশে রফতানি: ব্যবসায়ীদের একটি বড় অংশের দাবি, বিদেশে চিনিগুঁড়া চাল রফতানি করার কারণে স্থানীয় বাজারে তীব্র সরবরাহ সংকট তৈরি হয়েছে। সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে শীর্ষ তিনটি কোম্পানি ১,৫৩০ মেট্রিক টন সুগন্ধি চাল রফতানি করেছে।
২. উৎপাদন ও আবহাওয়া সংকট: গত মৌসুমে অনাবৃষ্টি ও তীব্র তাপপ্রবাহের কারণে উত্তরাঞ্চলে সুগন্ধি ধানের কাঙ্ক্ষিত ফলন হয়নি।
৩. বড় কোম্পানিগুলোর মজুত: বড় বড় চাল প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠানগুলো মৌসুমের শুরুতেই বেশি দামে ধান কিনে মজুত করায় ছোট মিল ও খোলা বাজারে ধানের সরবরাহ কমে গেছে।
৪. প্রক্রিয়াজাত ও পরিবহন ব্যয়: বিদ্যুৎ বিল, মিলিং খরচ এবং পরিবহন ভাড়া বৃদ্ধি পাওয়ায় উৎপাদন খরচ আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে।
বিপাকে ক্রেতা ও রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ীরা
দাম বাড়ায় কেনাকাটার পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দিয়েছেন ক্রেতারা। আগে যারা একবারে ৫ থেকে ১০ কেজি চাল কিনতেন, তারা এখন ১ থেকে ২ কেজিতে সীমাবদ্ধ থাকছেন। প্রভাব পড়েছে রেস্তোরাঁ ব্যবসাতেও। কুমারপাড়ার রেস্তোরাঁ মালিক মো. গোলাপ সরদার জানান, ১৩০ টাকার চাল ২০০ টাকায় কিনতে হলেও সে অনুযায়ী পোলাওর দাম বাড়ানো সম্ভব হয়নি, ফলে লোকসানের মুখে পড়তে হচ্ছে।
সুফল পাচ্ছে না কৃষক, বাজার নজরদারির দাবি
ধানের দাম ৭৫ কেজির বস্তাপ্রতি ৪ হাজার টাকা থেকে বেড়ে সাড়ে ৮ হাজার টাকা হলেও এর সুফল সাধারণ কৃষকের পকেটে যাচ্ছে না। গোদাগাড়ীর কৃষক আসফাকুজ্জামান বাবু জানান, দাম বাড়ার আগেই কৃষকরা তাদের ধান বিক্রি করে দিয়েছেন, লাভ পুরোটাই যাচ্ছে মধ্যস্বত্বভোগী ও মজুতদারদের পকেটে।
সব মিলিয়ে, বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি হচ্ছে কি না এবং রফতানির প্রভাবেই দাম বাড়ছে কি না—তা খতিয়ে দেখতে নিয়মিত বাজার নজরদারি জোরদার করার দাবি জানিয়েছেন সচেতন ক্রেতা ও ব্যবসায়ীরা।

